ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ২য় পত্র ৪র্থ অধ্যায় অনুধাবনমুলক প্রশ্ন উত্তর
প্রশ্ন-১। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির গঠন সম্পর্কে ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : বহু প্রাচীনকাল থেকেই পাশ্চাত্যের দেশগুলোর সাথে ভারত উপমহাদেশের বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। পর্তুগিজ, ওলন্দাজ, দিনেমার এ উপমহাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের সম্প্রসারণ ঘটায়।
ইংরেজরা তাদের সাফল্যে উৎসাহিত হয়ে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি’ নামে একটি বণিক সংগঠন তৈরি করে রানি এলিজাবেথের কাছ থেকে ১৫ বছরের জন্য সনদ নিয়ে ভারতবর্ষে বাণিজ্য করতে আসে। তারা সম্রাট জাহাঙ্গীরের অনুমতি নিয়ে ১৬১২ খ্রিষ্টাব্দে সুরাটে বাণিজ্যে কুঠি স্থাপন করে।
প্রশ্ন-২। ব্রিটিশ আমলে মুসলিম সমাজব্যবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে কেন?
উত্তর : ব্রিটিশ আমলে জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারে তৎকালীন মুসলিম সমাজব্যবস্থা শোচনীয় হয়ে পড়ে। হিন্দু প্রভাবিত সমাজব্যবস্থায় মুসলমানদের মধ্যে পির পূজা, কবর পূজা, মহররমের তাজিয়াপ্রথা, বিবাহ অনুষ্ঠানে নৃত্যগীত প্রভৃতি প্রচলিত ছিল।
উপরন্তু ইংরেজদের শোষণের ফলে বাংলার অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড ভেঙে পড়ে। অন্যদিকে হিন্দু জমিদার এবং নীলকরদের অত্যাচার ও উৎপীড়ন বাংলার জনগোষ্ঠীর জীবনকে যন্ত্রণাদায়ক করে তোলে। যোগেশচন্দ্র বাগল বলেন, জমিদার ও নীলকরদের অত্যাচারে মুসলমানদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল।
প্রশ্ন-৩। লর্ড ক্লাইভ দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন কেন?
উত্তর : ১। কোম্পানির প্রকৃত ক্ষমতা গোপন করা এবং উপমহাদেশে প্রতিদ্বন্দ্বী ইউরোপীয় বণিকদের সাথে সংঘর্ষে না জড়ানোর লক্ষে লর্ড ক্লাইভ দ্বৈত শাসন প্রবর্তন করেন । 2। ইংরেজ কোম্পানি রাজস্ব-সংক্রান্ত ব্যাপারে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ছিল। ৩। রাজস্ব ও দেওয়ানি শাসনভার সরাসরি গ্রহণ করার মতো উপযুক্ত কর্মচারীর একান্ত অভাব ছিল।
প্রশ্ন-৪ । লর্ড ক্লাইভ নিজের কৃতিত্বকে কীভাবে কলঙ্কিত করেছে? বর্ণনা কর।
উত্তর : লর্ড ক্লাইভ ভারতে নানাভাবে তার কৃতিত্বকে কলঙ্কিত করেছে। তার বিরুদ্ধে মীর জাফরের কাছ থেকে উৎকোচ গ্রহণ জালিয়াতির মাধ্যমে উমিচাদকে প্রতারণা, দস্তকের অপব্যবহার করে বাংলার অর্থ আহরণ, রেজা খান ও সেতাব রায় কর্তৃক বাংলায় জনসাধারণের ওপর অত্যাচার-উৎপীড়ন ইত্যাদির অভিযোগ ওঠে।
তার দ্বৈত শাসন নীতিতে বাংলায় অরাজকতা এবং চরম অর্থসংকট দেখা দেয়, যার ফলে ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে বহু লোকের প্রাণহানি ঘটে। যদিও তার আগেই ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে তাকে অপসারণ করে স্বদেশে ডেকে পাঠানো হয়।
প্রশ্ন-৫। তিতুমীর ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন কেন?
উত্তর : ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডারকে তিতুমীরের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন। ইংরেজদের এরূপ হঠকারিতায় তিনি ক্ষুদ্ধ হয়ে জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে সংগঠিত করেন।
তিতুমীর ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে চব্বিশ পরগনা, নদীয়া ও ফরিদপুর জেলার কিছু অংশ নিয়ে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র গঠন করেন। মিসকিন থাকে প্রধানমন্ত্রী এবং গোলাম মাসুম থাকে সেনাপতি নিযুক্ত করেন।
প্রশ্ন-৬। দেশীয় শাসকবর্গের ইংরেজবিরোধী মনোভাব ব্যাখ্যা কর ।
উত্তর : পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে এ দেশে ইংরেজ কোম্পানির আধিপত্য খুব দ্রুততার সাথে বিস্তৃতি লাভ করে এবং ভারতীয় রাষ্ট্রগুলো এর চাপ অনুভব করতে লাগল। কোম্পানির শাসকরা ছলে- বলে-কৌশলে দেশীয় রাজন্যবর্গের রাজ্য শাসনের ব্যাপারে তাদের হস্তক্ষেপ চালাতে থাকে।
ফলে দেশীয় শাসকরা ক্ষমতা হারিয়ে ইংরেজদের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। লর্ড ক্লাইভের দ্বৈতশাসন ও লর্ড ওয়েলেসলির অধীনতামূলক মিত্রতা নীতি ছিল এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। এ নীতির ফলে রাজনৈতিক ক্ষমতা হারিয়ে দেশীয় রাজন্যবর্গ দিশহারা হয়ে পড়লে মহীশূর, হায়দরাবাদ এবং মারাঠা রাষ্ট্রসংঘ একটি ত্রিশক্তি মিত্র সংঘ গঠন করে।
প্রশ্ন-৭। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত বলতে কী বোঝায় ?
উত্তর : সিপাহি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান কারণ ছিল চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত। লর্ড কর্নওয়ালিসের এ চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে জমিদার ও কৃষকগণ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ব্যবস্থার ফলে বাংলার কৃষকদের আর্থিক মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। ‘সূর্যাস্ত আইন’ কার্যকর হওয়ার পর অনেক জমিদার তাদের জমিদারি হারান। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে সম্পত্তি ছাড়া মুসলমানরা দিশেহারা হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন-৮। কীভাবে ইংরেজবিরোধী সংগ্রাম দমন করা হয়?
উত্তর : লর্ড ক্যানিং সিপাহি-জনতার ইংরেজবিরোধী সংগ্রাম দমনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহকে রেঙ্গুনে নির্বাসন দেওয়া হয়, মারাঠা নেতা পরাজিত হয়ে নেপালের জঙ্গলে আশ্রয় নেন এবং ঝাঁসির রানী যুদ্ধে নিহত হন।
রোহিলাখণ্ডের দেশপ্রেমিক আহমদ উল্লাহ বিশ্বাসঘাতক এক জমিদারের গুলিতে নিহত হন। এ ছাড়া বিদ্রোহীদের অনেককে কারাদণ্ড ও ফাঁসি দেওয়া হয়। ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্কেও অনেক সৈনিককে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। আর এভাবেই ১৮৫৮ খ্রিষ্টাব্দের জুলাই মাসের মধ্যে এ মহাবিদ্রোহের সমাপ্তি ঘটে।
প্রশ্ন-৯। হাজী মুহম্মদ মুহসীন ‘বাংলার হাতেমতাই’ নামে পরিচিত কেন?
উত্তর : যে দানবীর বাংলার দরিদ্র মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তার ও তাদের কল্যাণ সাধনের উদ্দেশ্যে উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত বিপুল সম্পত্তি মুক্তহস্তে দান করেছেন, তিনি হলেন হাজী মুহম্মদ মুহসীন।
সততা, সাধুতা, ধর্মপরায়ণতা, কর্তব্যপরায়ণতা, পরোপকারিতা ইত্যাদি ছিল তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকল সম্প্রদায়ের জন্য তিনি দান করেছেন তার ঐশ্বর্য। দানশীলতার জন্য তিনি ‘দানবীর’ ও ‘বাংলার হাতেমতাই’ নামে সুপরিচিত।
প্রশ্ন-১০। শিক্ষা বিস্তারে হাজী মুহম্মদ মুহসীনের অবদান ব্যাখ্যা কর ।
উত্তর : বাংলার দরিদ্র মুসলমানদের শিক্ষা বিস্তারে মুহসীনের দান- অতুলনীয় ও চিরস্মরণীয়। গরিব মেধাবী মুসলমান ছাত্ররা যাতে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হতে পারে, সে জন্য তিনি কলকাতায় ১৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে তার তৎকালীন এক লাখ ছাপান্ন হাজার টাকা মূল্যের সম্পত্তি দিয়ে ‘মুহসীন ট্রাস্ট’ গঠন করেন।
সকল সম্প্রদায়ের ছাত্ররা শিক্ষার জন্য এই অর্থ লাভ করত। অবশেষে ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে নবাব আবদুল লতিফ, স্যার উইলিয়াম হান্টার প্রমুখ ব্যক্তির চেষ্টায় ‘মুহসীন ট্রাস্টের’ অর্থ বাংলার মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে এবং গরিব মেধাবী মুসলমান ছাত্রদের বৃত্তি প্রদানে ব্যয় করার ব্যবস্থা করা হয়।
মুহসীন ট্রাস্টের টাকায় হুগলি কলেজ প্রতিষ্ঠা ছাড়াও হুগলি, রাজশাহী, ঢাকা ও চট্টগ্রামে চারটি মাদ্রাসা এবং সেই সাথে ছাত্রাবাসও প্রতিষ্ঠিত হয়। এ ছাড়া মুহসীন সকল ধর্মের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর্থিক সাহায্যদান করেন।
প্রশ্ন-১১। নবাব আবদুল লতিফকে ‘বাংলার সৈয়দ আহমদ’ বলা হয় কেন?
উত্তর : ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলার মুসলমানদের উন্নতির জন্য যে কয়জন ব্যক্তি অসামান্য অবদান রেখেছিলেন, তাদের মধ্যে নবাব আবদুল লতিফ অন্যতম। তার অক্লান্ত প্রচেষ্টা ও সাধনার ফলে তৎকালীন বাংলার মুসলিম সমাজ আশু ধ্বংসের হাত থেকে মুক্তির পথ খুঁজে পায় ।
তিনি উত্তর ভারতের স্যার সৈয়দ আহমদের ন্যায় বাংলার মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করে তাদের মধ্যে আধুনিক চিন্তা ও চেতনার নবজাগরণ ঘটান। এ জন্য তাকে ‘বাংলার সৈয়দ আহমদ’ বলা হয়।
প্রশ্ন-১২। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গভঙ্গের ঘোষণা কীরূপ ছিল?
উত্তর : ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই জুলাই বঙ্গভঙ্গের সিদ্ধান্ত সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়। এতে বলা হয় যে, আসাম, ঢাকা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিভাগ, পার্বত্য ত্রিপুরা, দার্জিলিং ও রাজশাহী বিভাগ একত্র করে পূর্ব বাংলা ও আসাম নামে এক নতুন প্রদেশ গঠিত হবে এবং সে প্রদেশের শাসনভার একজন স্বতন্ত্র লেফটেন্যান্ট গভর্নর বা ছোট লাটের উপর ন্যস্ত থাকবে। ঢাকা হবে এ নতুন প্রদেশের রাজধানী এবং নতুন প্রদেশ আপাতত কলকাতা হাইকোর্টের এরিয়াভুক্ত থাকবে।
অল্প সময়ের মধ্যেই ঢাকায় একটি নতুন হাইকোর্ট স্থাপন করা হবে। অন্যদিকে পশ্চিম বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যাকে একত্র করে অপর একটি প্রদেশ গঠিত হবে। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই অক্টোবর বাংলা বিভাগের দিন ধার্য হয়।
গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর
প্রশ্ন-১৩। ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শক্তি বৃদ্ধি হয় কীভাবে?
উত্তর : ১৬১৫ খ্রিষ্টাব্দে ইংল্যান্ডের রাজা প্রথম জেমসের দূত স্যার টমাস রো সম্রাট জাহাঙ্গীরের দরবারে আসেন এবং তার প্রচেষ্টায় ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বিশেষ কতকগুলো সুযোগ-সুবিধা অর্জন করে।
১৬৫১ খ্রিষ্টাব্দে বাংলার সুবাদার শাহ সুজার অনুমতি নিয়ে তারা হুগলিতে বাণিজ্য কুঠি নির্মাণ করে। পরবর্তীকালে তাঁরা কাশিমবাজার, ঢাকা ও মালদহে কুঠি স্থাপন করে শক্তি বৃদ্ধি করে।
১৭১৭ খ্রিষ্টাব্দে সম্রাট ফররুখ শিয়ারের অনুমতি নিয়ে ইংরেজরা বাংলা, মাদ্রাজ ও বোম্বে বিনা শুল্কে অবাধ বাণিজ্য করতে থাকে। পাশাপাশি এ উপমহাদেশে সাম্রাজ্য স্থাপনের নীলনকশা আঁকতে থাকে।
প্রশ্ন-১৪ । নবাবকে কোম্পানির দ্বারস্থ হতে হয় কেন?
উত্তর : দ্বৈত শাসনের ফলে দেশরক্ষার ব্যবস্থা থাকে কোম্পানির হাতে এবং বিচার ও শাসনভার থাকে নবাবের হাতে। নবাবকে নামমাত্র সিংহাসনে বসিয়ে রেখে কোম্পানিই সকল ক্ষমতা ভোগ করে। এ অবস্থায় নবাব পেল ক্ষমতাহীন দায়িত্ব আর কোম্পানি পেল দায়িত্বহীন ক্ষমতা।
নবাবের রাজস্ব আদায়ের অধিকার না থাকার কারণে সেনাবাহিনী পরিচালনা করার মতো অর্থবল ছিল না। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ভার নবাবের হাতে থাকায় প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য নবাবকে কোম্পানির দ্বারস্থ হতে হয়।
প্রশ্ন-১৫। লর্ড ক্লাইভের দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা বিলোপ করা হয় কীভাবে?
উত্তর : লর্ড ক্লাইভের দ্বৈতশাসন ব্যবস্থায় ইংরেজ কোম্পানির অবহেলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের কাহিনি ব্রিটিশ পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হলে ব্রিটিশ নাগরিকরা এর বিরুদ্ধে বিক্ষুব্ধ হয়ে পড়ে। তুমুল বিতর্কের মুখে ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সামগ্রিকভাবে দেশের শাসনভার গ্রহণ করে।
ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যগণের সুপারিশক্রমে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির শাসনকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ১৭৭৩ খ্রিষ্টাব্দে নিয়ামক আইন পাস হয়। এরই মাধ্যমে দ্বৈতশাসন ব্যবস্থার বিলুপ্তি ঘটে।
প্রশ্ন-১৬। জমিদাররা ইজারাদারে পরিণত হয় কেন?
উত্তর : বাংলায় দ্বৈতশাসনের ফলে ‘আমিলদারি’ প্রথার উজ্জ্ব হয়। বিভিন্ন জেলার জমিদাররা ‘আমিলদারদের’ কাছে রাজস্ব জমা দিত। যে জমিদার যত বেশি রাজস্ব দিতে পারত, আমিলরা তাদেরই রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দিত। ফলে জমিদাররা ইজারাদারে পরিণত হয়। বাংলার মানুষ হতদরিদ্র ও অসহায় হয়ে পড়ে।
প্রশ্ন-১৭। লর্ড ক্লাইভ আত্মহত্যা করে কেন?
উত্তর : লর্ড ক্লাইভের বিরুদ্ধে উৎকোচ গ্রহণ এবং দুর্নীতির অভিযোগে সোচ্চার আন্দোলন শুরু হয়। ১৭৬৭ খ্রিষ্টাব্দে বোর্ড অব ডাইরেক্টরস তাকে স্বদেশে ডেকে পাঠান।
বাংলাদেশে জালিয়াতি এবং ঘুষ গ্রহণের অপরাধে স্বদেশবাসী তার বিরুদ্ধে পার্লামেন্টে অভিযোগ উত্থাপন করেন। বিচারে তিনি নির্দোষ প্রমাণিত হন। কিন্তু জনগণের ধিক্কারে অতিষ্ঠ হয়ে তিনি ১৭৭৪ খ্রিষ্টাব্দে বিষপানে আত্মহত্যা করেন।
প্রশ্ন-১৮। তিতুমীর সৈয়দ আহমদের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন কীভাবে?
উত্তর : ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে তিতুমীর দিল্লির শাহি পরিবারের এক ব্যক্তির সঙ্গী হয়ে মক্কায় হজ পালন করতে যান। সেখানে তিনি সৈয়দ আহমদ বেরলভির সংস্পর্শে আসেন এবং তার নিকট তিনি আধ্যাত্মিক ও রাজনৈতিক শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
প্রশ্ন-১৯। ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের বিপ্লবকে ‘জাতীয় সংগ্রাম’ বলা হয় কেন?
উত্তর : ১৮৫৭ খ্রিষ্টাব্দের সিপাহি বিপ্লব ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে প্রথম স্বাধীনতা সংগ্রাম। এ বিপ্লবকে কোনো কোনো ঐতিহাসিক ‘জাতীয় সংগ্রাম’ বলেছেন।
তবে সিপাহিদের সাথে। জনগণের অংশগ্রহণের গুরুত্ব অনুধাবন করে একে ‘সিপাহি বিদ্রোহ’ বা ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’ না বলে বরং ভারতীয় উপমহাদেশের মহাবিদ্রোহ বলা যেতে পারে। এর ফলেই ভারতে কোম্পানি শাসনের অবসান ঘটে ব্রিটিশরাজ ও পার্লামেন্ট ভারতের শাসনভার গ্রহণ করে।
প্রশ্ন-২০। দেশীয় শাসকরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন কেন?
উত্তর : ইংরেজরা সুদীর্ঘ দুইশ বছরের শাসনামলে ভারত থেকে সোনা, রূপা প্রভৃতি মূল্যবান ধাতু ও সম্পদ ব্রিটেনে পাচার করে। কোম্পানির তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী লর্ড ক্লাইভ ভারতে লুণ্ঠনের মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ দ্বারা ব্রিটেনে অন্যতম ধনীতে পরিণত হয়। কোম্পানির এমন লুণ্ঠনে সাধারণ জনগণ ও দেশীয় শাসকরা উত্তেজিত হয়ে পড়েন।
প্রশ্ন-২১। হাজী মুহম্মদ মুহসীন কীভাবে সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন?
উত্তর : লক্ষ্ণৌর নবাব আসাফউদ্দৌলার আমন্ত্রণে হাজী মুহম্মদ মুহসীন কিছুকাল দরবারে অবস্থান করেন। এদিকে বোন মুন্নুজান বিধবা হন। এবং বয়সের ভারে জীর্ণ মুন্নুজানের পক্ষে বিশাল সম্পত্তি দেখাশোনা করা সম্ভব ছিল না। লক্ষ্ণৌর দরবারে থাকাকালীন বোনের চিঠি পেয়ে তিনি হুগলিতে ফিরে যান এবং ফিরে এলে বোন মুন্নুজান তার সমুদয় সম্পত্তি দেখাশোনার ভার তার উপর অর্পণ করেন।
পরে ১৮০৩ খ্রিষ্টাব্দে বোন মুন্নুজানের মৃত্যুর আগে তার বিশাল সম্পত্তির মালিক করে যান মুহসীনকে। এভাবে হাজী মুহম্মদ মুহসীন তার বোনের সম্পত্তির উত্তরাধিকারী হন। মুহসীন বিশাল সম্পত্তি পেলেও দীন- দরিদ্রের মতো জীবনযাপন করতেন।
প্রশ্ন-২২। নবাব আবদুল লতিফ কীভাবে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি মুসলমানদের আগ্রহ সৃষ্টি করেন?
উত্তর : ইংরেজি শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে নবাব আবদুল লতিফ লিখেছেন, “যদি ভারতের কোনো ভাষা শিক্ষার্থীর জীবনকে উন্নত করতে পারে, তবে তা হলো ইংরেজি।” এ উদ্দেশ্যে তিনি ১৮৫২ খ্রিষ্টাব্দে “ইংরেজি শিক্ষায় মুসলিম ছাত্রদের সুযোগ-সুবিধা” শিরোনামে নিখিল ভারত প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা আহবান করেন।
তার এ রচনা প্রতিযোগিতা তৎকালে মুসলমান ছাত্রদের মধ্যে দারুণ উৎসাহ ও উদ্দীপনা সৃষ্টি করেছিল। নবাব আবদুল লতিফের সক্রিয় প্রচেষ্টায় কলকাতা মাদ্রাসায় ইংরেজি, ফার্সি বিভাগ খোলা হয়। তিনি সরকারের কাছে মুসলমানদের উচ্চ শিক্ষাব্যবস্থার দাবি জানান।
প্রশ্ন-২৩। খ্রিষ্টান ধর্ম প্রচারে ভারতীয় হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সন্দেহ সৃষ্টি হয় কেন?
উত্তর : খ্রিষ্টান ধর্মযাজকদের প্রকাশ্যে ধর্ম প্রচার ভারতীয়দের মনে দারুণ সন্দেহ সৃষ্টি করে। তারা স্কুল-কলেজে, বাজারে-বন্দরে, এমনকি জেলখানায়ও জোরেশোরে ধর্ম প্রচার করতে থাকে। কোনো কোনো সরকারি স্কুলে বাইবেল পড়ানো হতো এবং এতিম ও বিপদগ্রস্তদের মাঝেমধ্যে খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত করা হতো।
১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে আইন পাস করা হয় যে, কোনো হিন্দু খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করলে তাকে পৈতৃক সম্পত্তি ভোগের অধিকার দেওয়া হবে। এতে করে হিন্দু- মুসলমানদের মাঝে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়।
প্রশ্ন-২৪। ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস গঠন করা হয় কীভাবে?
উত্তর : ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষিত হিন্দুরা সুরেন্দ্রনাথ ও আনন্দ মোহন বসুর নেতৃত্বে কলকাতার অ্যালবার্ট হলে এক সম্মেলনে মিলিত হন। এ সম্মেলনে বিভিন্ন স্থান থেকে আগত প্রতিনিধিরা একটি সর্বভারতীয় সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন।
ভারতীয়দের অধিকার আদায়ের সচেতনতা ও চলমান বিক্ষোভে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিরাপত্তা বিপন্ন হওয়ার আশঙ্কায় লর্ড ডাফরিন ও ইংরেজ আমলা অ্যালান অক্টাভিয়ান হিউম প্রশাসনিক দৃষ্টিকোণ থেকে ভারতীয়দের অসন্তোষ প্রশমিত করার প্রয়োজন উপলব্ধি করেন।
পরবর্তীকালে হিউম ভারতের ভাইসরয় লর্ড ডাফরিনের সহযোগিতায় ১৮৮৫ খ্রিস্টাব্দের ২৮শে ডিসেম্বর বোম্বে শহরে। “ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন। ২ জন মুসলমানসহ ৭০ জন প্রতিনিধি কংগ্রেসের প্রথম অধিবেশনে যোগ দেয় এবং এর সভাপতি হন বাঙালি ব্যারিস্টার উমেশচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়।
প্রশ্ন ২৫। কীভাবে মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
উত্তর : সিমলা ডেপুটেশনের পর মুসলিম প্রতিনিধিরা একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ব্যাপারে আলোচনা করেন। ঢাকার নবাব সলিমুল্লাহ নিখিল ভারত মুসলিম কনফেডারেশন গঠনের প্রস্তাব দেন। ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার শাহবাগে অনুষ্ঠিত হয় ‘মোহামেডান এডুকেশনাল কনফারেন্সের বার্ষিক সম্মেলন।
সম্মেলনের শেষ দিন ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দের ৩০শে ডিসেম্বর উপস্থিত নেতৃবৃন্দ নবাব ভিকারুল মূলকের সভাপতিত্বে একটি রাজনৈতিক সভায় মিলিত হন।
সভায় নবাব সলিমুল্লাহ “নিখিল ভারত লীগ’ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তাব করলে হাকিম আফজাল খান, জাফর আলী খান, মুহাম্মদ আলী প্রমুখ মুসলিম নেতা তা সমর্থন করেন। এভাবেই মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠিত হয়।
প্রশ্ন-২৬। ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের বঙ্গভঙ্গের ফলাফল কীরূপ ছিল? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : ১৯০৫ খ্রিষ্টাব্দের বঙ্গভঙ্গের ফলাফল ছিল সুদূরপ্রসারী। ঢাকা রাজধানী ও নতুন প্রশাসনিক কেন্দ্র হওয়ায় এখানে গড়ে ওঠে স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, হাইকোর্ট, অফিস-আদালত, প্রেস ইত্যাদি।
অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি সাধিত হয়। এ জন্যই পূর্ববঙ্গের মানুষ বঙ্গভঙ্গকে স্বাগত জানায়।
বঙ্গভঙ্গের অব্যবহিত পরেই ঢাকায় সুরম্য অট্টালিকা, হাইকোর্ট, সেক্রেটারিয়েট, কার্জন হল প্রভৃতি নির্মিত হতে থাকে এবং নতুন উদ্দীপনায় বঙ্গবাসী নিজেদের ভাগ্য উন্নয়নে ব্রতী হয়। হিন্দুদের বিরোধিতার কারণে মুসলমানগণ অধিকার সচেতন হয়ে গঠন করে মুসলিম লীগ নামে রাজনৈতিক সংগঠন।
প্রশ্ন-২৭। গান্ধীজির নেতৃত্বে আন্দোলনের তীব্রতা ভারতীয় উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে কীভাবে?
উত্তর : গান্ধীজির নেতৃত্বে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলন যুক্তভাবে পরিচালিত হওয়ায় এটি অল্পদিনেই একটি দুর্বার আন্দোলনে পরিণত হয়। হিন্দু ও মুসলমান সকলেই এই আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যোগ দেয়।
গান্ধীজির আহ্বানে মতিলাল নেহরু, চিত্তরঞ্জন দাশ, রাজেন্দ্র প্রসাদ, রাজা গোপালাচারী প্রমুখ প্রখ্যাত আইনজীবী তাদের আইন ব্যবসা পরিত্যাগ করেন।
ছাত্রছাত্রীরা স্কুল-কলেজ ত্যাগ করে, বিলেতি দ্রব্য বর্জন ও পোড়ানো হয়, শ্রমিকরা কলকারখানা ত্যাগ করে। সর্বত্র দেশীয় দ্রব্যসামগ্রী ব্যবহারের হিড়িক পড়ে যায়। ফলে এ আন্দোলন অল্প সময়ের মধ্যেই ভারতীয় উপমহাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে।
প্রশ্ন-২৮। ব্রিটিশ সরকারের দমননীতি কীরূপ ছিল- ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : ভারতবর্ষে অসহযোগ আন্দোলনের তীব্রতা লক্ষ করে সরকার কঠোরহস্তে এ আন্দোলন দমন করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়। অহিংস . আন্দোলনে অংশ নেওয়া নিরস্ত্র ভারতবাসীর উপর চালানো হয় সরকারের অকথ্য নির্যাতন। গান্ধীজি ব্যতীত কংগ্রেস ও খেলাফতের সকল নেতাকেই কারারুদ্ধ করা হয়।
কংগ্রেস সরকারের এ দমননীতির বিরুদ্ধে আইন অমান্য করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। গান্ধীজি গভর্নর জেনারেলকে জানান, সাত দিনের মধ্যে বন্দিদের মুক্ত করা না হলে দেশবাসীকে রাজস্ব না দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হবে।
প্রশ্ন-২৯। ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয় কীভাবে?
উত্তর : লাহোর প্রস্তাবের ফলে ভারতের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক আন্দোলনে এক নতুন ধারা সৃষ্টি হয়। এর ফলে মুসলমানরা স্বতন্ত্র জাতিসত্তায় উদ্বুদ্ধ হয়।
লাহোর প্রস্তাবের পর হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে অবিশ্বাস ও সন্দেহ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন স্থানে দাঙ্গা বেঁধে যায় এবং একসময় তা প্রচণ্ড সাম্প্রদায়িক সংঘর্ষে রূপ নেয়। লাহোর প্রস্তাবের আলোকে ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের আগস্টে ভারত ও পাকিস্তান নামে দুটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
প্রশ্ন-৩০। ইংরেজদের প্রতি মুসলমানদের বৈরী মনোভাব ব্যাখ্যা কর ।
উত্তর : পলাশীর যুদ্ধের পর থেকে রাজ্যহারা মুসলমানরা ইংরেজ বিতাড়নের জন্য সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত, ইংরেজি শিক্ষার প্রবর্তনসহ নানা কারণে মুসলমানগণ হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে পড়ে।
ফলে তারা ইংরেজদের প্রতি ক্ষুদ্ধ হয়ে মুসলমানদের জন্য আলাদা রাষ্ট্র গঠনে তৎপর হয়। মুসলমানরা ইংরেজি শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়, যা পরবর্তীকালে তাদের মধ্যে আলাদা স্বাতন্ত্র্যবোধ সৃষ্টি করে। ১৯২৯ খ্রিষ্টাব্দে জিন্নাহর ১৪ দফার পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানদের আলাদা রাষ্ট্রের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন-৩১। লর্ড মাউন্ট ব্যাটেনের প্রস্তাব মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস সমর্থন করে কেন?
উত্তর : লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন উল্লেখ করেন যে, “ভারত বিভাগ ছাড়া ভারতে শান্তি প্রতিষ্ঠার কোনো বিকল্প পথ নেই।” তার পরিকল্পনায় ‘ভারত’ ও ‘পাকিস্তান’ নামে দুটি পৃথক রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব করা হয়। দেশীয় রাজ্যগুলোকে ‘পাকিস্তান’ অথবা ‘ভারত’ ডোমিনিয়নে যোগদান করার স্বাধীনতা দেওয়া হয়।
বাংলা ও পাঞ্জাবকে বিভক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। দুই দেশের সীমানা চিহ্নিতকরণের জন্য স্যার র্যাডক্লিফের নেতৃত্বে একটি কমিশনও নিয়োগ করা হয়, তাই মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস লর্ড মাউন্ট ব্যাটনের প্রস্তাব সমর্থন করে।
প্রশ্ন-৩২। মন্ত্রিমিশন পরিকল্পনা কীরূপ ছিল?- ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে নির্বাচনের ফলাফল অনুযায়ী কাজ হবে বলে সিমলা বৈঠকে যে সিদ্ধান্ত হয়, সে সূত্রমতে ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে শ্রমিক দল ‘কেবিনেট মিশন’ নামে একটি প্রতিনিধিদল ভারতে প্রেরণ করে। ভারত- সচিব লর্ড পেথিক লরেন্সের নেতৃত্বে গঠিত এ মিশনের অপর দুজন সদস্য ছিলেন স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস ও এ. ভি. আলেকজান্ডার।
জিন্নাহ তাদের কাছে পাকিস্তানের দাবির যৌক্তিকতা তুলে ধরেন। এ মিশন কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ নেতাদের সাথে আলোচনার পর ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দের মে মাসে ভারতের প্রস্তাবিত শাসনতন্ত্র সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করে। ইতিহাসে এটি ‘মন্ত্রীমিশন পরিকল্পনা’ নামে পরিচিত।
প্রশ্ন-৩৩। শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন কেন?
উত্তর : লাহোর প্রস্তাবের উত্থাপক শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক জিন্নাহর ‘দ্বিজাতিতত্ত্বে’ বিশ্বাসী ছিলেন না। লাহোর প্রস্তাবের কোথাও “দ্বিজাতিতত্ত্বের” উল্লেখ নেই। তিনি হিন্দু-মুসলিমের পৃথক সত্তার কথা বিশ্বাস করতেন না।
তার বাঙালিত্ববোধের কারণে জিন্নাহর সাথে তার দ্বন্দ্ব হয়। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক বাঙালি মুসলমানদের রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনের লক্ষ্যে লাহোর প্রস্তাব উত্থাপন করেন।
প্রশ্ন-৩৪ । মুসলিম লীগ মন্ত্রিমিশন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে কেন?
উত্তর : মন্ত্রিমিশন প্রস্তাব দারুণ আলোড়ন সৃষ্টি করে। পাকিস্তান গঠনে সহায়ক বিবেচনা করে মুসলিম লীগ মন্ত্রিমিশন প্রস্তাব মেনে নেয়। কিন্তু সাম্প্রদায়িক নীতি অনুসারে প্রদেশগুলোকে বিভক্ত করায় কংগ্রেস অন্তর্বর্তীকালীন সরকারে যোগদানে অস্বীকৃতি জানায়।
কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের দ্বন্দ্বে মুসলিম লীগ এককভাবে সরকার গঠনের দাবি জানায়। এমতাবস্থায় ভাইসরয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের বিষয়টি স্থগিত করলে ক্ষুব্ধ হয়ে মুসলিম লীগ মন্ত্রিমিশন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
প্রশ্ন-৩৫ । কীভাবে ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে?
উত্তর : ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ২৫শে জুলাই মাউন্ট ব্যাটেন দেশীয় রাজাদের নিয়ে একটি সভা ডাকেন এবং ১৫ই আগস্টের মধ্যে ভারতীয় স্বাধীনতা সম্পর্কে তাদের অবহিত করেন। রাজাদের তাদের সুবিধা ও ভৌগোলিক অবস্থান অনুযায়ী ভারত বা পাকিস্তানে যোগ দেওয়ার পরামর্শ দেন।
অতঃপর ভারত স্বাধীনতা আইন অনুযায়ী ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ও ১৫ই আগস্ট যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারত নামে দুটি স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পাকিস্তান রাষ্ট্রের গভর্নর জেনারেল হলেন মুহম্মদ আলী জিন্নাহ এবং ভারতের গভর্নর জেনারেল হলেন ব্রিটিশ ভারতের শেষ গভর্নর জেনারেল লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন নওয়াবজাদা লিয়াকত আলী খান। এভাবেই ভারত ও পাকিস্তান রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।
প্রশ্ন-৩৬। নবাব আবদুল লতিফের সময়ে বাংলার মুসলমানদের অবস্থা কীরূপ ছিল?
উত্তর : পলাশী যুদ্ধে পরাজিত হয়ে মুসলমানরা ঘৃণাভরে, ইংরেজি | শিক্ষা বর্জন করে, ফলে তারা পেছনে পড়ে যায়। আর হিন্দুরা ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণ করে সরকারি চাকরিসহ নানা সুযোগ-সুবিধা লাভ করতে থাকে। ফারসির পরিবর্তে ইংরেজি চালু হলে ইংরেজি না জানা মুসলমানরা সরকারি চাকরি হারায়।
অন্যদিকে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে লিপ্ত হয়ে মুসলমানরা ইংরেজদের বিরাগভাজন হয়। নবাব আবদুল লতিফ মুসলমানদের উদ্ধারকল্পে ব্রিটিশদের সাথে সহযোগিতা গড়ে তুলতে এগিয়ে আসেন।
প্রশ্ন-৩৭। খেলাফত আন্দোলন কীভাবে তীব্রতর হয়?- বর্ণনা কর।
উত্তর : ১৯১৮ খ্রিষ্টাব্দে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে ব্রিটিশরা তাদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে। মিত্রপক্ষ ‘প্যারিস চুক্তির’ মাধ্যমে তুর্কি সাম্রাজ্যের ব্যবচ্ছেদ এবং খলিফাকে অমর্যাদা করে। ফলে ‘বিক্ষুব্ধ ভারতীয় মুসলমানরা খলিফার মর্যাদা ও তুরস্কের অখণ্ডতা রক্ষার উদ্দেশ্যে এক আন্দোলন গড়ে তোলে।
এই আন্দোলন ইতিহাসে খেলাফত আন্দোলন নামে পরিচিত। মাওলানা মোহাম্মদ আলী, মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দে জেল থেকে বের হয়ে এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেন।
১৯২০ খ্রিষ্টাব্দে মিত্রপক্ষ তুরস্কের ওপর ‘সেভার্স চুক্তি’ চাপিয়ে দিয়ে তুরস্ক সাম্রাজ্যকে চূড়ান্তভাবে খণ্ড-বিখণ্ড করার এবং তুরস্কের সার্বভৌমত্ব বিলুপ্তির উদ্যোগ নিলে খেলাফত আন্দোলন তীব্রতর হয়।






