ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিঃ ২য় পত্র ১ম অধ্যায় অনুধাবন প্রশ্ন উত্তর
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ২য় পত্র ১ম অধ্যায় অনুধাবন প্রশ্ন উত্তর এই পোস্টটি এইচএসসি শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ১ম অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ অনুধাবনমূলক প্রশ্ন সহজ ভাবে তুলে ধরা করা হয়েছে।
প্রশ্ন-১। ভারতবর্ষকে ‘হিমালয়ের দান’ বলা হয় কেন?
উত্তর : ভারতবর্ষ হলো এশিয়া মহাদেশের দক্ষিণাংশের সর্ববৃহৎ উপদ্বীপ। এ দেশটি মোট আয়তনের দিক থেকে রাশিয়া বাদে ইউরোপ মহাদেশের সমান।
এর উত্তর-পশ্চিম ও উত্তর-পূর্বে হিমালয় পর্বত অবস্থিত। এ হিমালয় পর্বত ভারতবর্ষকে সুরক্ষা দান করছে। এ কারণে ভারতবর্ষকে ‘হিমালয়ের দান’ বলা হয়।
প্রশ্ন-২। মুহাম্মদ বিন কাসিম কীভাবে সিন্ধু জয় করেন?
উত্তর : মুসলমানদের ভারত অভিযানের পূর্বে সিন্ধুর রাজা ছিলেন দাহির। তিনি ছিলেন অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী শাসক। তার কুশাসনে সমগ্র সিন্ধুতে জলদস্যু ও চোর-ডাকাত বৃদ্ধি পায়, রাজ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
সিন্ধু সমগ্র ভারত থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে ভারতবাসীগণ সিন্ধু সম্পর্কে উৎসাহী ছিল না। হিন্দু রাজপুত শাসকগণ দাহিরের প্রতি সন্তুষ্ট না থাকায় তার বিপদে এগিয়ে না এসে বরং বিশ্বাসঘাতকতা করে।
এভাবেই রাজা দাহিরের অদক্ষতা, অযোগ্যতা, কুশাসন ও সামরিক শক্তির দুর্বলতার বিরুদ্ধে মুহাম্মদ বিন কাসিম ও তার সৈন্যের দক্ষতা ও সাহসিকতায় সিন্ধু বিজয় সহজ হয়ে ওঠে।
প্রশ্ন-৩। মুসলমানরা ভারত জয়ে আকৃষ্ট হয় কেন?
উত্তর : ভারতীয় উপমহাদেশ প্রাচীনকাল থেকেই প্রাকৃতিক ধনৈশ্বর্যের | জন্য বিখ্যাত ছিল। এ ধনৈশ্বর্যের কারণেই ভারতবর্ষকে বহুবার বৈদেশিক আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে ও মোকাবিলা করতে হয়েছে।
আবার বিদেশি বণিকগণ ব্যবসায়-বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে এ উপমহাদেশে এসে তা সম্প্রসারিত করার সুযোগ পেয়েছে। তাছাড়া এ দেশের সুগন্ধি মসলা ও মূল্যবান মণি-মুক্তা বিদেশিদের বার বার আকৃষ্ট করেছে।
ভারতবর্ষের এই ধন ও ঐশ্বর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়েই মুসলমানরা তাদের ব্যবসায়- বাণিজ্যকে সম্প্রসারিত করার উদ্দেশ্যে ভারত জয়ে প্রলুব্ধ হয় ।
প্রশ্ন-৪। ভারতীয়রা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ছিল উন্নত ও সমৃদ্ধ। – ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : মুসলমানদের ভারত বিজয়ের পূর্বে সেখানকার অধিবাসীরা জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প-সাহিত্যচর্চায় ছিল অসামান্য দক্ষতার অধিকারী।
এ সময়ে ভারতের সর্বত্র স্কুল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো পশ্চিম ভারতের বল্লভী, বিহারের নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। এ সময় জ্যোতির্বিজ্ঞান, দর্শন, গণিত, সাহিত্যচর্চা করা হতো এবং আর্যভট্ট, ব্রহ্মগুপ্ত, বানভট্ট, কালিদাস, জয়দেব প্রমুখ কবি ও সাহিত্যিক সমাজে যথেষ্ট খ্যাতিমান ছিলেন।
স্থাপত্য ও ভাস্কর্যশিল্পের অন্যতম নিদর্শন ছিল অজন্তা, ইলোরা, কারী, গান্ধার ইত্যাদি। মোটকথা, প্রাক-ইসলামি যুগে ভারতীয়রা সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ছিল উন্নত ও সমৃদ্ধ।
প্রশ্ন-৫। হাজ্জাজ কেন ভারত আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন?
উত্তর : হাজ্জাজ বিন ইউসুফ সিন্ধুরাজ দাহিরের উপর ক্ষুব্ধ হয়ে ভারত আক্রমণের সিদ্ধান্ত নেন। সিংহলে বসবাসকারী কিছুসংখ্যক আরব বণিকের মৃত্যু হলে সিংহলরাজ সেসব পরিবার এবং খলিফা আল ওয়ালিদ ও হাজ্জাজের জন্য কিছু মূল্যবান উপহার-উপঢৌকন আটটি জাহাজে পূর্ণ করে আরবের উদ্দেশ্যে প্রেরণ করেন।
কিন্তু সিন্ধুর নিকটবর্তী দেবল বন্দরে জাহাজগুলো জলদস্যুদের দ্বারা নুষ্ঠিত হয়। হাজ্জাজ এর ক্ষতিপূরণ দাবি করেন। কিন্তু সিন্ধুরাজ দাহির এতে কর্ণপাত না করায় তিনি ভারত আক্রমণে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন।
প্রশ্ন—৬। মুহাম্মদ বিন কাসিমকে হত্যা করা হয় কেন?
উত্তর : সিন্ধু ও মুলতান বিজয়ের পর মুহাম্মদ বিন কাসিম সমগ্র ভারত বিজয়ের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু খলিফা ওয়ালিদের মৃত্যুতে তিনি নতুন খলিফা সোলায়মানের রোষানলে পড়েন।
কথিত আছে, রাজা দাহিরের দুই কন্যার প্রতি অশোভন আচরণের জন্য দাহির খলিফার নিকট মুহাম্মদ বিন কাসিমের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেন।
এতে খলিফা ক্রুদ্ধ হয়ে কাসিমকে শাস্তি দিলে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। মূলত খলিফার ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণেই প্রথমে কাসিমকে বন্দি ও পরে হত্যা করা হয়।
প্রশ্ন-৭। সিন্ধুতে কীভাবে আরব শাসনের পতন হয়?
উত্তর : উত্থান-পতন প্রকৃতির চিরন্তন নিয়ম। এরই ধারাবাহিকতায় মুহাম্মদ বিন কাসিম ৭১২ খ্রিষ্টাব্দে সিন্ধুতে যে আরব শাসনের সূত্রপাত ঘটান বিভিন্ন কারণে তারও পতন ঘটে।
ক্ষুদ্র হিন্দু রাজপুত রাজ্যগুলোর ক্রমবর্ধমান শক্তি, কাসিম পরবর্তী শাসকদের অযোগ্যতা, দুর্বলতা, সামরিক শক্তির ব্যর্থতা, খলিফার উদাসীনতা, রাজ্যবিস্তার নীতি পরিহার, অপ্রতুল সৈন্যসংখ্যা, খেলাফতের কেন্দ্রীয় শক্তির দুর্বলতার কারণে সিন্ধুতে আরব শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত ও সুসংহত না হয়ে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়।
প্রকৃতপক্ষে মুহাম্মদ বিন কাসিমের আকস্মিক মৃত্যু এবং দামেস্ক থেকে সিন্ধুর দূরত্বের কারণেও সিন্ধুতে আরব শাসন বেশি দিন কার্যকর রাখা সম্ভব হয়নি। এভাবেই ধীরে ধীরে হিন্দুরা তাদের হৃত রাজ্য পুনরুদ্ধারে উৎসাহিত হয় এবং আরব শাসনের পতন ঘটে।
প্রশ্ন-৮। ভারতবর্ষে কীভাবে ইসলাম প্রতিষ্ঠা পায়?
উত্তর : ভারতবর্ষে ইসলাম প্রতিষ্ঠায় সিন্ধু বিজয় একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কেননা, বহু আগে থেকে আরবদের আগমন থাকলেও প্রকৃতপক্ষে মুহাম্মদ বিন কাসিমের এ অভিযানই ভারতবর্ষে ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রকে সুদূরপ্রসারী করে।
বহু পির, দরবেশ, আউলিয়া এ দেশে এসে ইসলামের শাশ্বত বাণী ছড়িয়ে দেন। এদের প্রচারিত সাম্য, মৈত্রী, সহিষ্ণুতা ও উদারতার নীতি এ দেশের নিম্নশ্রেণির হিন্দুকে আকৃষ্ট করে। ফলে তারা দলে দলে ইসলামে দীক্ষিত হয় এবং ভারতবর্ষের সর্বত্র ইসলামের প্রসার ঘটে।
প্রশ্ন-৯। সুলতান মাহমুদ ভারত আক্রমণ করেন কেন?
উত্তর : সবুক্তগিনের পুত্র ছিলেন গজনি অধিপতি সুলতান মাহমুদ। তিনি ইসমাইলকে পরাজিত ও বিতাড়িত করে গজনির সিংহাসনে বসেন। তিনি ছিলেন একজন উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও সাম্রাজ্যবাদী।
তিনি বাগদাদের খলিফার নিকট থেকে “ইয়ামিন উদ দৌলা’ উপাধি লাভের পর প্রতিবছর ভারতবর্ষে একটি করে অভিযান চালানোর জন্য মনস্থির করেন। এছাড়াও গজনি রাজ্যের শ্রীবৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য আর্থিক প্রয়োজন এবং সাম্রাজ্যবাদী নেশার বশবর্তী হয়ে তিনি ভারত আক্রমণ করেন।
প্রশ্ন-১০। ইন্দো-মুসলিম কৃষ্টির উন্মেষ ঘটে কীভাবে?
উত্তর : আরবদের সিন্ধু বিজয়ের ফলে হিন্দু ও মুসলিম দুটি জাতির সহাবস্থান ঘটে। এতে প্রথমবারের মতো হিন্দুদের সংস্পর্শে আসে আরবরা।
একত্রে বাস করার ফলে উভয় জাতির মধ্যে সাংস্কৃতিক আদান- প্রদান আরম্ভ হয়, যা সুলতান মাহমুদের আক্রমণ দ্বারা আরও জোরদার হয়। এর দরুন এই দুই ধর্মের পারস্পরিক ভাব বিনিময়, ও সমঝোতার সম্পর্ক তৈরি হয় । এভাবেই ইন্দো-মুসলিম কৃষ্টির উন্মেষ ঘটে।
প্রশ্ন-১১। মহাকবি ফেরদৌসি কেন গজনি ত্যাগ করেন?
উত্তর : সুলতান মাহমুদের দরবারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি ছিলেন ফেরদৌসি। তার আসল নাম আবুল কাশেম মনসুর। তার রচিত ‘শাহনামা’ গ্রন্থটি তাকে খ্যাতির শীর্ষে অবস্থান দিয়েছে। এ গ্রন্থ রচনার জন্য সুলতান মাহমুদ তাকে ৬০,০০০ স্বর্ণমুদ্রা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন।
কিন্তু মাহমুদ তার একজন প্রিয়পাত্রের প্ররোচনায় ৬০,০০০ স্বর্ণমুদ্রার পরিবর্তে ৬০,০০০ রৌপ্যমুদ্রা প্রদান করতে চাইলে ফেরদৌসি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সুলতানের প্রতি কটাক্ষপূর্ণ ব্যঙ্গ কবিতা রচনা করে চিরকালের জন্য গজনি ত্যাগ করে তুসনগরে গমন করেন।
প্রশ্ন-১২। আলাউদ্দিন হুসেনকে ‘জাহানসুজ’ বলা হয় কেন?
উত্তর : ঘোরের ক্ষুদ্র তুর্কি পার্বত্য রাজ্য গজনি ও হিরাতের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত। ঘোরের প্রধানগণ মূলত গজনির রাজা ছিলেন এবং সুলতান মাহমুদের উত্তরাধিকারীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তারা তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন করেন।
বাহরাম নামে সুলতান মাহমুদের একজন উত্তরাধিকারী কুতুবউদ্দিন মুহাম্মদ ও সাইফুদ্দিন নামে দুইজন ঘোর যুবরাজকে হত্যা করেন।
এই রক্তপাতকে কেন্দ্র করে নিহত যুবরাজদ্বয়ের ভ্রাতা আলাউদ্দিন হুসেন গজনি নগরী আক্রমণ করেন। সাত দিন সাত রাত পর্যন্ত আগুন জ্বালিয়ে ও লুটতরাজ করে তিনি গজনি ধ্বংস করে ভ্রাতৃহত্যার প্রতিশোধ গ্রহণ করেন। এজন্য আলাউদ্দিন হুসেনকে ‘জাহান সুজ’ বলা হয়।
প্রশ্ন-১৩। সুলতান মাহমুদের ভারত বিজয়ের অর্থনৈতিক ফলাফল কী ছিল? ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : সুলতান মাহমুদ বার বার ভারত আক্রমণ করে প্রচুর ধনসম্পদ হস্তগত করেছিলেন । তিনি উত্তর ভারতীয় রাজ্যগুলো থেকে যে বিপুল পরিমাণ ধনরত্ন লুণ্ঠন করেছিলেন, তার ফলে উত্তর ভারতীয় রাজ্যগুলোর অর্থনৈতিক ভিত্তি শিথিল হয়ে পড়েছিল।
অপরপক্ষে, সেসব ধনরাশি গজনির সৌন্দর্য, উন্নতি ও খ্যাতিতে ব্যয় করা হয়। এ ছাড়া সুলতানের যুদ্ধ ও শান্তিকালীন মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভারতের এই সম্পদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
প্রশ্ন-১৪ । মুসলমানদের ভারতবর্ষ আক্রমণের পথ কীরূপ ছিল— ব্যাখ্যা কর?
উত্তর : মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতীয় উপমহাদেশের অবস্থা ছিল খুবই শোচনীয়। কেন্দ্রীয় শক্তির অভাবে ভারতবর্ষে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র স্বাধীন রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল এবং এরা পরস্পর দ্বন্দ্ব-কলহে লিপ্ত হয়ে পড়েছিল।
তৎকালীন ভারতের বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে বিদ্যমান সামাজিক বৈষম্য, কঠোর জাতিভেদ প্রথা, রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও অন্তর্দ্বন্দ্বের ফলে মুসলমানদের ভারতবর্ষ আক্রমণের পথ সহজতর হয়ে ওঠে। এ দ্বন্দ্বমূলক রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণেই ভারতবর্ষে মুসলমানদের জয়যাত্রা সূচিত হয় এবং রাজত্বের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
প্রশ্ন-১৫। সুখপাল তার নাম পরিবর্তন করেন কেন?
উত্তর : সুখপাল পাঞ্জাবের শাসনকর্তা আনন্দপালের পুত্র। সুলতান মাহমুদ মুলতান জয়ের পথে আনন্দপালকে পরাজিত করেন। এ পরাজয়ের পর তিনি কাশ্মীরে পলায়ন করেন।
মুলতান থেকে প্রত্যাবর্তনের সময় সুলতান মাহমুদ আনন্দপালের পুত্র সুখপালকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের শর্তে শাসনভার অর্পণ করেন।
তাই সুখপাল শাসনভার গ্রহণের জন্য ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং সুখপাল নামের পরিবর্তন করে নওয়াজ শাহ নাম ধারণ করেন।
প্রশ্ন-১৬। মুসলিম বিজয়ের প্রাক্কালে ভারতবর্ষের সামাজিক অবস্থা কীরূপ ছিল?
উত্তর : মুসলিম বিজয়ের পূর্বে ভারতবর্ষের সামাজিক অবস্থায় চরম বর্ণবৈষম্যের চিত্র প্রতিফলিত হয়। সমাজের উচ্চ স্থানে ছিল ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়রা; আর বৈশ্য ও শূদ্ররা ছিল অধঃপতিত ও নিষ্পেষিত।
সে সমাজে মেয়েদের কোনো মর্যাদা ছিল না। সমগ্র দেশেই মূর্তিপূজার প্রচলন ছিল, বাল্যবিবাহ ও সতীদাহ প্রথা চালু ছিল। হিন্দুধর্ম কুসংস্কারে ভারাক্রান্ত ছিল, যা বিভিন্ন দলের মধ্যে ঐক্য স্থাপন অসম্ভব করে তুলেছিল।
প্রশ্ন-১৭ । প্রাক-ইসলামি ভারতবর্ষের বর্ণবৈষম্য কেমন ছিল বুঝিয়ে লেখ?
উত্তর : প্রাক-ইসলামি ভারতবর্ষের সমাজব্যবস্থায় প্রকট বর্ণবৈষম্যের চিত্র প্রতিফলিত হয়। সে সমাজে ব্রাহ্মণ ও ক্ষত্রিয়দের প্রভাব শীর্ষে থাকলেও বৈশ্য ও শূদ্ররা ছিল অধঃপতিত ও নিষ্পেষিত।
পার্থিব সকল মর্যাদা, সুখসম্পদ ভোগ, ধর্মকর্ম আইন-প্রণয়ন, শাসনদণ্ড পরিচালনায় ব্রাহ্মণরা কার্যকর ভূমিকা পালন করত।
অন্যদিকে, ক্ষত্রিয়রা যুদ্ধবিগ্রহ, বৈশ্যরা ব্যবসায় বাণিজ্য এবং শূদ্ররা কৃষিকাজ করত। বর্ণিত চার শ্রেণি ছাড়া বাকি হিন্দুদের অচ্ছ্যুৎ মনে করা হতো। বলা যায়, ভারতবর্ষ একটি কঠোর বর্ণ-নীতির আওতায় আবদ্ধ ছিল।
প্রশ্ন-১৮ । সিন্ধুতে আরব শাসনব্যবস্থা কীরূপ ছিল?
উত্তর : মুহাম্মদ বিন কাসিমের সময় সিন্ধুতে একটি উদারনৈতিক দক্ষ, ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা প্রণীত হয়েছিল। সব ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ছিল তার শাসনব্যবস্থার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
প্রত্যেক ধর্মের লোকজন স্বাধীনভাবে তাদের ধর্মকর্ম পালন করতে পারত। বিচারকাজেও নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করতেন কাসিম। এ ক্ষেত্রে হিন্দু-মুসলিম কোনো বৈষম্য ছিল না। সিন্ধুতে আরবদের প্রবর্তিত শাসনব্যবস্থা পরবর্তী ইতিহাসকে প্রভাবিত করেছিল।
প্রশ্ন-১৯। আরবদের সিন্ধু বিজয় কি নিষ্ফল বিজয় ছিল? ব্যাখ্যা কর?
উত্তর : আরবদের সিন্ধু বিজয় ছিল একটি ঐতিহাসিক যুগান্তকারী ঘটনা। এ বিজয়ে আরবরা সেখানে একটি দক্ষ, উদারনৈতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা চালু করে।
ভারতের সাথে আরবীয়দের বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও প্রসারিত হয়। এ বিজয়ের মাধ্যমে আরববাসী সর্বপ্রথম হিন্দুদের সংস্পর্শে আসে এবং দুটি জাতির সহাবস্থানের ফলে সমাজব্যবস্থার ইতিবাচক প্রসার ঘটে এবং প্রতিষ্ঠা পায়।
হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন, সামাজিক রীতি-নীতি ও ভাবের আদান-প্রদানের ফলে ইন্দো-আরবীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়, তথা সাংস্কৃতিক দ্বার উন্মুক্ত হয়। সুতরাং আরবদের সিন্ধু বিজয় কোনো নিষ্ফল বিজয় নয়।
প্রশ্ন-২০। মুহাম্মদ ঘুরির ভ্রাতৃভক্তি কেমন ছিল?
উত্তর : মুহাম্মদ ঘুরির বড় ভাই গিয়াসউদ্দিন ফিরোজ কোহের সুলতান ছিলেন। মুহাম্মদ ঘুরি তার বড় ভাইকে অত্যন্ত সম্মান করতেন।
মুসলিম সাম্রাজ্যের অধিপতি হয়েও তিনি বড় ভাইয়ের শ্রেষ্ঠত্ব এবং তার এলাকার সার্বভৌমত্ব মেনে নিতেন। যুদ্ধলব্ধ সামগ্রীর মধ্য থেকে বাছাই করা মূল্যবান জিনিস তিনি বড় ভাইয়ের জন্য পাঠাতেন।
ঐতিহাসিক কুতুব মিনারে খোদিত গজনির সুলতানদের নামের তালিকায়ও বড় ভাই গিয়াস উদ্দিনের নাম সবার উপরে স্থান পেয়েছে ।
প্রশ্ন-২১। আরবদের সিন্ধু বিজয় কীভাবে সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন ঘটায়?
উত্তর : আরবদের সিন্ধু বিজয়ের ফলে আরববাসী সর্বপ্রথম হিন্দুদের সংস্পর্শে আসে এবং দুটি জাতির সহাবস্থানের কারণে সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন সাধিত হয়।
সামাজিক জীবনে তারা একে অন্যের রীতি-নীতি, অনেকাংশে গ্রহণ করে। এমনকি আরব সৈন্যরা সেখানে স্থায়ী বসতি স্থাপন করে। ভারতীয়দের সাথে বাণিজ্যিক সম্পর্ক আরও সম্প্রসারিত ।
উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন, সামাজিক রীতিনীতি ও ভারের আদান প্রদানের ফলে একটি নতুন জাতির উজ্জ্ব ঘটে যা ইন্দো- আরবীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতির ধারক ও বাহকের খ্যাতি লাভ করে।
প্রশ্ন-২২। আলগিন কীভাবে গজনিতে স্বাধীন রাজ্য স্থাপন করেন?
উত্তর : আলগিন ছিলেন সামানিদ বংশের পঞ্চম সুলতান আব্দুল মালেকের একজন ক্রীতদাস। নিজের প্রতিভার গুণে তিনি সামানি বংশের প্রাদেশিক শাসনকর্তার পদে উন্নীত হন।
পরবর্তীতে তিনি ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি দ্বিতীয় পত্র (একাদশ-দ্বাদশ শ্রেণি) সামানিদ বংশের দুর্বলতার সুযোগে গজনি রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।
অর্থাৎ দশম শতকের মধ্যভাগে আফগানিস্তানের সুলেমান পার্বত্য অঞ্চলের আলপ্তগিন নামক এক সামান্য ভাগ্যান্বেষী তুর্কি কর্তৃক তার সৌভাগ্যবলেই গজনিতে স্বাধীন রাজ্য স্থাপিত হয়।
প্রশ্ন-২৩। জয়পাল আত্মাহুতি দিলেন কেন?
উত্তর : সুলতান মাহমুদ ১০০১ খ্রিষ্টাব্দে ধর্মের ধ্বজা উড্ডীন করার জন্য এবং ন্যায়, সত্য ও সুবিচার স্থাপনের জন্য জয়পালের বিরুদ্ধে অভিযান চালান।
জয়পালও তার সামগ্রিক শক্তি নিয়ে তার মোকাবিলা করেন, কিন্তু তারপরও পরাজিত হন। যুদ্ধে তার ১৫ হাজার সৈন্য প্রাণ হারায় এবং অসংখ্য অনুচরসহ জয়পাল মাহমুদের হাতে বন্দি হন।
অবশ্য পরে জয়পাল আড়াই লক্ষ দিনার ও দেড়শ’ হাতি মুক্তিপণ দেওয়ার শর্তে মুক্তিলাভ করেন। কিন্তু পরাজয়ের এ গ্লানি সহ্য করতে না পেরে জয়পাল তার পুত্র আনন্দপালকে রাজ্যভার অর্পণ করে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতি দেন।
প্রশ্ন-২৪ । সুলতান মাহমুদ মুলতান জয় করেন কীভাবে?
উত্তর : ১০০৬ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান মাহমুদ মুলতান আক্রমণের পরিকল্পনা করেন। তিনি পাঞ্জাবের মধ্য দিয়ে মুলতানের দিকে অগ্রসর হন।
কিন্তু পাঞ্জাবের শাসনকর্তা আনন্দপালের সাথে মূলতানের শাসনকর্তা ফতেহ দাউদের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় আনন্দপাল মাহমুদকে বাধা দেন, কিন্তু পরাজিত হয়ে কাশ্মীরে পলায়ন করেন।
মাহমুদ সাত দিন অবরোধের পর মুলতান জয় করেন এবং ধনসম্পদ নিয়ে গজনিতে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে ১০১০ খ্রিষ্টাব্দে মাহমুদ মুলতান অধিকার করেন এবং ফতেহ দাউদকে পরাজিত ও বন্দি করেন।
প্রশ্ন ২৫। সুখপালকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয় কেন?
উত্তর : সুলতান মাহমুদ মুলতান থেকে প্রত্যাবর্তনের পূর্বে সুখপালকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের শর্তে শাসনভার অর্পণ করেন। সুখপালও ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে নিজের নাম পরিবর্তন করেন এবং শাসনভার গ্রহণ করেন।
কিন্তু মাহমুদের যুদ্ধ ব্যস্ততার সুযোগে তিনি ধর্মত্যাগ করেন। ফলে মাহমুদ তার ধৃষ্টতার উপযুক্ত শাস্তি প্রদানের জন্য তার বিরুদ্ধে যুদ্ধাভিযান করেন। এতে সুখপাল পরাজিত হলে মাহমুদ তার নিকট থেকে চার লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা আদায় করেন এবং তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন।
প্রশ্ন-২৬। মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সর্বযুগের একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বলার কারণ কী?
উত্তর : মুহাম্মদ বিন কাসিম সর্বপ্রথম ভারতবর্ষের মাটিতে মুসলমানদের জয়যাত্রার সূচনা করেন। তিনি ছিলেন একজন সুদক্ষ সেনাপতি, প্রতিভাবান এবং জনহিতৈষী শাসক।
তিনি উদারনৈতিক এবং ধর্মনিরপেক্ষ শাসনব্যবস্থা দ্বারা স্থানীয় জনগণকে আকৃষ্ট করেন। তিনি শত্রুর প্রতি ছিলেন কঠোর এবং মিত্রের প্রতি ছিলেন দয়ালু।
বিচারকাজে তিনি নিরপেক্ষতার নীতি অনুসরণ করতেন, হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে কোনো পার্থক্য করতেন না। এজন্যই মুহাম্মদ বিন কাসিমকে সর্বযুগের একজন শ্রেষ্ঠ ব্যক্তি বলা হয়েছে।
প্রশ্ন-২৭। মাহমুদ পাঞ্জাবের আধিপত্য লাভ করেন কীভাবে?
উত্তর : পাঞ্জাবের শাসনকর্তা আনন্দপাল ১০০৬ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান মাহমুদের নিকট পরাজিত হন। তবে পরাজিত হলেও তিনি মনোবল হারাননি।
বরং শত্রুপক্ষকে প্রচণ্ড বাধাদানের জন্য শক্তি সঞ্জয় করতে থাকেন লবণগিরি অঞ্চলে। কিন্তু সেখানেই তিনি মৃত্যুবরণ করেন এবং তার পুত্র ত্রিলোচনপাল তার স্থলাভিষিক্ত হন।
সুলতান মাহমুদ ১০১৪ খ্রিষ্টাব্দে তাকে পরাজিত করে নান্দনা অধিকার করলে তিনি কাশ্মীরে আশ্রয় গ্রহণ করেন। কিন্তু মাহমুদ পুনরায় অভিযান চালিয়ে ত্রিলোচন পালকে পরাজিত করে পাঞ্জাবের আধিপত্য লাভ করেন।
প্রশ্ন-২৮। সোমনাথ বিজয় মাহমুদের ললাটে নতুন বিজয়ের গৌরবসংযুক্ত করে – ব্যাখ্যা কর ।
উত্তর : তৎকালীন ভারতবর্ষে ধন-রত্নের আগার ছিল কাথিয়াগড়ের নিকটবর্তী সোমনাথ মন্দির। এ মন্দিরে স্বর্ণ ও রৌপ্যের মূর্তিসহ প্রচুর ধনসম্পদ ছিল। মাহমুদের সব অভিযানের মধ্যে সোমনাথ অভিযান অন্যতম।
কেননা, হিন্দুদের ধারণা ছিল এই মন্দির বিজয় করার সাধ্য কারও নেই। তাদের এ বিশ্বাসকে চূর্ণ করে সুলতান মাহমুদ ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে সোমনাথ মন্দির আক্রমণ করেন এবং জয়লাভ করেন।
মাহমুদ মন্দিরের মূর্তি ভেঙে ফেলেন এবং দুই কোটি স্বর্ণমুদ্রাসহ প্রচুর ধনসম্পদ হস্তগত করেন। তাই বলা যায়, সোমনাথ বিজয় মাহমুদের ললাটে নতুন বিজয়ের গৌরব সংযুক্ত করে।
প্রশ্ন-২৯ । সুলতান মাহমুদের ভারত অভিযানের উদ্দেশ্য কী ছিল?
ব্যাখ্যা কর। উত্তর : সুলতান মাহমুদ ছিলেন সেই যুগের শ্রেষ্ঠ সৈন্যাধ্যক্ষদের অন্যতম এবং একজন শ্রেষ্ঠ বিজেতা। তিনি ছিলেন উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং সাম্রাজ্যবাদী ।
উচ্চাকাঙ্ক্ষামূলক পরিকল্পনাদি কার্যকর করার জন্য প্রচুর অর্থের প্রয়োজন ছিল। আর ভারতবর্ষ প্রাচীনকাল থেকেই ধনৈশ্বর্যের ভাণ্ডার।
তাছাড়াও ভারতীয় রাজাগণ সন্ধিচুক্তি ভঙ্গ করে মাহমুদের আনুগত্য অস্বীকার করেন এবং তার ভারতীয় মিত্রবর্গকে অত্যাচার, উৎপীড়ন করেন। তাই সুলতান মাহমুদ তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণের জন্য ভারত অভিযানে ব্রতী হন।
প্রশ্ন-৩০। মাহমুদের ভারত বিজয় ইসলামের ভবিষ্যৎ অগ্রগতির পথ উন্মুক্ত করে। – ব্যাখ্যা কর ।
উত্তর : মাহমুদের ভারত অভিযানের উদ্দেশ্য যদিও ধর্ম প্রচার ছিল না, তথাপি প্রত্যক্ষভাবে না হলেও পরোক্ষভাবে তার ভারত বিজয়ের সাফল্য এ দেশে ইসলামের ভবিষ্যৎ অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করেছিল।
কারণ, তার আক্রমণকালে মুসলিম পির-ফকিরগণ ভারতে আগমন করেছিলেন এবং ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছিলেন।
তাদের দ্বারাই এই দেশে ইসলামের ক্ষেত্র প্রসারিত হয়। মাহমুদই প্রথম ভারতবর্ষের অভ্যন্তরে ইসলামের পতাকা বহন করে নিয়ে যান। সুতরাং বলা যায় যে, মাহমুদের ভারত বিজয় ইসলামের ভবিষ্যৎ অগ্রগতির পথ প্রশস্ত করেছিল।
প্রশ্ন-৩১। সুলতান মাহমুদকে এশিয়ার ইতিহাসের একজন অত্যাশ্চর্য ব্যক্তি বলা হয় কেন?
উত্তর : সুলতান মাহমুদ ছিলেন বুদ্ধিমান, ধর্মভীরু, কবি, শিল্প ও সাহিত্য অনুরাগী এবং জ্ঞানীর পৃষ্ঠপোষক। সাধারণভাবে তিনি ন্যায়পরায়ণতা ও সুবিচারের পক্ষপাতী হলেও কখনো কখনো নিজ স্বার্থসিদ্ধির জন্য নীচতার আশ্রয় নিতেও কুণ্ঠাবোধ করতেন না।
তিনি ছিলেন সহিষ্ণুতার প্রতীক। হিন্দুদের তিনি স্বাধীনভাবে ধর্মপালন করার অধিকার দান করেছিলেন। তার ধর্মপরায়ণতা কখনো কখনো ধর্মনিষ্ঠায় পর্যবসিত হলেও তা আবার অর্থের বিনিময়ে ত্যাগ করতে দ্বিধাবোধ করতেন না।
উল্লিখিত বিষয়সমূহ এবং তার বীরত্ব, জ্ঞান, অসীম বুদ্ধিমান ও অন্যান্য গুণ তাকে এশিয়ার ইতিহাসে একজন অত্যাশ্চর্য ব্যক্তি হিসেবে অঙ্কিত করে।
প্রশ্ন-৩২। শাসক হিসেবে সুলতান মাহমুদ কেমন ছিলেন?
উত্তর : শাসক হিসেবে সুলতান মাহমুদ অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। প্রজাদের ধন-প্রাণ রক্ষা ও বিচারকাজে ন্যায় ও সততা রক্ষা করার উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে তিনি প্রজাদের কৃতজ্ঞতাভাজন হয়েছিলেন।
শরিয়তের নির্দেশমতে অপরাধীর শাস্তির বিধানকালে তিনি তার পুত্র ও স্বজনকেও রেহাই দেননি। বিচারকাজে হিন্দু-মুসলিম কোনো ভেদাভেদ করতেন না।
প্রজাদের জানমাল রক্ষার্থে সদা প্রস্তুত ছিলেন। একটি সুগঠিত, সুশৃঙ্খল ও সুনিয়ন্ত্রিত সরকারব্যবস্থার মাধ্যমে তিনি প গজনি রাজ্যকে গৌরবের শীর্ষে উপনীত করেছিলেন।
প্রশ্ন-৩৩। গজনি বংশের পতন ঘটেছিল কেন?
উত্তর : সুলতান মাহমুদের মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার নিয়ে তার দুই ভর পুত্রের মধ্যে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এ গৃহযুদ্ধ মাসুদ থেকে শুরু করে মওদুদ চর পর্যন্ত চলে।
মওদুদের মৃত্যুর পর সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শেষ সুলতান খসরু মালিকের পতনের মধ্য দিয়ে গজনি বংশের অবসান ধ্য ঘটে। প্রকৃতপক্ষে সুলতান মাহমুদের পরবর্তী উত্তরাধিকারীদের দুর্বলতা, অযোগ্যতা ও জনসমর্থনের অভাবে গজনি বংশের পতন ঘটে।
তার উত্তরাধিকারীদের আরামপ্রিয়তা ও বিলাসিতার কারণে তারা র সাম্রাজ্য রক্ষার যোগ্যতা হারায় এবং তাদের পারস্পরিক দ্বন্দ্ব-সংঘাত গজনি বংশের পতনকে ত্বরান্বিত করে।
প্রশ্ন-৩৪ । আল বিরুনির বর্ণনায় ভারতের হিন্দু সমাজের প্রকৃতি কীরূপ ছিল?
উত্তর : সুলতান মাহমুদের দরবারের অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষীদের মধ্যে আল বিরুনি বিশেষভাবে সমাদৃত। তিনি তার রচনায় অত্যন্ত উদার ও র মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ভারতের হিন্দু সমাজকে বিশ্লেষণ করেছেন।
তার বর্ণনানুযায়ী ভারতে অনেক ছোট ছোট হিন্দু রাজা রাজত্ব করতেন, র তারা সবাই ছিলেন স্বাধীন এবং পারস্পরিক যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত থাকতেন।
তৎকালীন সমাজে সতীদাহ প্রথা ও বাল্যবিবাহের প্রচলন ছিল। হিন্দুরা = দেব-দেবীর পূজা করত, এজন্য সমগ্র দেশে অসংখ্য মন্দির নির্মাণ করা হয়েছিল। এসব মন্দিরে হিন্দুরা ধনসম্পদ গচ্ছিত রাখত এবং এ ধনসম্পদের লোভে বহিঃশত্রুরা বারবার ভারত আক্রমণ করত।
সে সময় শিক্ষিত হিন্দুদের মধ্যে একেশ্বরবাদের ধারণা বিদ্যমান ছিল। কুসংস্কার ও বর্ণবাদ তখন হিন্দু সমাজে প্রকট আকার ধারণ করেছিল। সুলতান মাহমুদের বারবার আক্রমণের ফলে এ দেশের ধনসম্পদ যে প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে সম্পর্কেও তিনি তার বর্ণনায় উল্লেখ করেছেন ।
প্রশ্ন-৩৫। জয়চাদ পৃথ্বীরাজকে সাহায্য করেনি কেন?
উত্তর : গহরওয়াল বংশের শেষ রাজা ছিলেন জয়চাদ। জয়চাদের সুন্দরী কন্যাকে জোর করে অপহরণ করায় পৃথ্বীরাজের প্রতি তিনি বিরূপ ভাব পোষণ করেন।
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে দুই রাজ্যের মধ্যে শত্রুতা সৃষ্টি হয়। ফলে ঘুরির ভারত আক্রমণকালে জয়জাদ পৃথ্বীরাজকে কোনো রকম সাহায্য করা থেকে বিরত থাকেন। তাদের মধ্যকার এ শত্রুতা মুহাম্মদ ঘুরির ভারত বিজয়কে ত্বরান্বিত করেছিল।
প্রশ্ন-৩৬। তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধের পরিণতি কী হয়েছিল?
উত্তর : তরাইনের প্রথম যুদ্ধের পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে মুহাম্মদ ঘুরি আবার যুদ্ধের ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তিনি তার প্রশিক্ষিত ও সুসজ্জিত সৈন্যবাহিনী নিয়ে তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে অবতীর্ণ হন এবং বিশেষ রণকুশলতার বলে পৃথ্বীরাজকে পরাজিত করেন।
পরাজিত পৃথ্বীরাজ পলায়নকালে বন্দি ও নিহত হন। এ যুদ্ধে জয়লাভের ফলে দিল্লির উপকণ্ঠ পর্যন্ত মুসলিম অধিকার বিস্তৃত হয়। তরাইনের এ বিজয়ে উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ভিত্তি রচিত হয়েছিল।
প্রশ্ন-৩৭। উত্তর ভারতে মুসলিম আধিপত্যের ভিত্তি স্থাপিত হয় কীভাবে?
উত্তর : তরাইনের দ্বিতীয় যুদ্ধে মুহাম্মদ ঘুরির জয়লাভ হিন্দুস্তানের উপর মুসলিম আক্রমণের চরম সাফল্য রচনা করেছিল। এ বিজয় ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম শাসনের ভিত্তি রচনা করেছিল।
এ যুদ্ধে জয়লাভের ফলে মুসলিম অধিকার প্রায় দিল্লির উপকন্ঠ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এর পর থেকে হিন্দুগণ আর মুসলিম আক্রমণের সামনে দাঁড়াতে সক্ষম হয়নি। তরাইনের এই যুদ্ধের মাধ্যমে উত্তর ভারতে মুসলিম আধিপত্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়।
৬০,০০০ স্বর্ণমুদ্রার পরিবর্তে ৬০,০০০ রৌপ্যমুদ্রা প্রদান করতে চাইলে ফেরদৌসি তা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেন এবং সুলতানের প্রতি কটাক্ষপূর্ণ ব্যঙ্গ কবিতা রচনা করে চিরকালের জন্য গজনি ত্যাগ করে তুসনগরে গমন করেন।
প্রশ্ন-৩৮ । বখতিয়ার খলজি কীভাবে বাংলা জয় করেন?
উত্তর : বখতিয়ার খলজির বাংলা ও বিহার জয় মুহাম্মদ ঘুরির বিজয়ের চেয়েও চমকপ্রদ। তৎকালীন পূর্ব ভারতে বাংলা ও বিহারের ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন যথাক্রমে পাল ও সেন বংশীয় রাজাগণ। কুতুবউদ্দিন আইবেকের সেনাপতি বখতিয়ার খলজি প্রথমে মদন ও কুমার পালকে পরাজিত করে বিহার জয় করেন।
এ সময় বাংলার সেনবংশীয় রাজা লক্ষ্মণ সেনের বার্ধক্যজনিত ও দুর্বলতাজনিত কারণে বাংলার শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়। আর এ সুযোগের উপযুক্ত ব্যবহার করে বখতিয়ার খলজি লক্ষ্মণ সেনকে পরাজিত করে বাংলা অধিকার করেন ।
প্রশ্ন-৩৯ । মুহাম্মদ ঘুরির মৃত্যু হয় কীভাবে?
উত্তর : জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা গিয়াসউদ্দিনের মৃত্যুর পর মুহাম্মদ ঘুরি গজনি, ঘোর ও দিল্লির অধিপতি হন। মধ্য এশিয়ায় সাম্রাজ্য স্থাপনের আশায় খাওয়ারিজম শাহের সাথে যুদ্ধে ঘুরি পরাজিত হন।
এ সংবাদে মুলতান ও অন্যান্য স্থানে বিদ্রোহ দেখা দিলে কুতুবউদ্দিনের সহায়তায় ঘুরি সকল বিদ্রোহ দমন করেন এবং মুলতান ও গজনি পুনরুদ্ধার করেন। কিন্তু গজনিতে প্রত্যাবর্তনের পথে তিনি ১২০৬ খ্রিষ্টাব্দে গুপ্ত ঘাতকের হাতে নিহত হন।
প্রশ্ন-৪০। মুহাম্মদ ঘুরি ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন কেন?
উত্তর : মুহাম্মদ ঘুরি মহান ব্যক্তিত্ব ও অনুপম চরিত্রের অধিকারী ছিলেন বলে তিনি ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন । তিনি আল্লাহভক্ত, বিশ্বাসী, ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু শাসক হিসেবে সমাদৃত।
তিনি গিয়াসউদ্দিনের প্রতি যে সততা ও বিশ্বস্ততার পরিচয় দিয়েছেন, ইতিহাসে তার কোনো তুলনা হয় না। ঘুরি জয়লাভের আনন্দে যেমন আত্মহারা হতেন না তেমনি পরাজয়েও নিরুৎসাহিত হতেন না।
ধৈর্য, আত্মবিশ্বাস ও অধ্যবসায় দ্বারা তিনি সব বাধা অতিক্রম করতেন। সর্বোপরি তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে মুসলিম সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠাতা ।
প্রশ্ন-৪১। ঘুরি বংশের পতন কীভাবে ঘটেছিল?
উত্তর : ঘুরি বংশের পতন ঘটে মূলত ঘুরির উত্তরাধিকারীদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে। নিঃসন্তান মুহাম্মদ ঘুরির মৃত্যুর পর তার ভ্রাতুষ্পুত্র মাহমুদ সিংহাসনে অধিষ্ঠিত হন।
তার দুর্বলতা ও অযোগ্যতার সুযোগে সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চলসমূহের উপর তাজউদ্দিন ইলদুজ, নাসিরউদ্দিন কুবাচা ও কুতুবউদ্দিন আইবেক নামের তিনজন শক্তিশালী শাসক তাদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
অতঃপর মাহমুদের মৃত্যুর পর সিংহাসনের অধিকার নিয়ে তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের সূত্রপাত ঘটে। আর এ সুযোগে খাওয়ারিজম শাহ ঘোর সাম্রাজ্যের অধিকাংশ অঞ্চল অধিকার করলে ঘুরি বংশের পতন ঘটে ।
প্রশ্ন-৪২। ভারতে মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মুহাম্মদ ঘুরির কৃতিত্ব বেশি কীভাবে ?
উত্তর : ভারতে প্রথম পর্যায়ের মুসলিম অভিযান পরিচালনা করে আরবরা, কিন্তু তারা বিজয় লাভ করলেও সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেনি। দ্বিতীয় পর্যায়ের ইয়ামেনি বংশের সবুক্তগিন ও সুলতান মাহমুদের বারবার অভিযানের ফলও আশানুরূপ ছিল না।
এ সময়ে কেবল পাঞ্জাবে তাদের একটি রাজ্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু মুহাম্মদ ঘুরির নেতৃত্বে তৃতীয় পর্যায়ের আক্রমণে বিজয়ী হয়ে মুসলিম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করা হয়। এ জন্যই ভারতের মুসলমানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে মুহাম্মদ ঘুরির অবদানই বেশি।
প্রশ্ন-৪৩। মুহাম্মদ ঘুরির ভারত অভিযান পরিচালনাকালে এখানকার রাজনৈতিক অবস্থা কেমন ছিল?
উত্তর : মুহাম্মদ ঘুরির ভারত অভিযানকালে এখানে রাজনৈতিক ঐক্য ছিল না। ছোট ছোট সামন্তরাজগণ স্বাধীনভাবে চলতেন এবং পরস্পরের সাথে কলহে লিপ্ত ছিলেন। কেন্দ্রীয় শক্তির অনুপস্থিতিতে সর্বত্র বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছিল।
এ সময়ে গুজরাটের রাজা ভীম ১০২৬ খ্রিষ্টাব্দে সুলতান মাহমুদ সোমনাথ অভিযান পরিচালনা করলে রাজ্য ছেড়ে পলায়ন করেন। এভাবে ভারতের রাজশক্তিগুলো যখন বহুধাবিভক্ত এবং গৃহযুদ্ধে লিপ্ত তখন মুহাম্মদ ঘুরি ভারত আক্রমণ করে সহজেই জয়লাভ করতে সক্ষম হন।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ২য় পত্র ১ম অধ্যায় অনুধাবন প্রশ্ন উত্তর পোস্টটি নিয়মিত অনুশীলন করলে তোমরা পরীক্ষার জন্য ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ও সাজেশন পেতে আমাদের ওয়েবসাইটটি নিয়মিত ভিজিট করো।







