অথবা, গাযালি কিভাবে দার্শনিকদের শ্রেণিবিভাগ করেছেন ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : ভূমিকা : মুসলমানদের চরম সংকটকালে সত্যবাণী ও প্রজ্ঞার প্রবল শক্তি নিয়ে নতুন সূর্যের মত ইমাম আল গাযালি আবির্ভূত হন। তিনি ১০৫৮ খ্রিস্টাব্দে ইরানের তুস নগরে জন্মগ্রহণ করেন। মুসলিম দর্শন তথা জ্ঞান জগতের অন্যতম মৌলিক চিন্তাবিদ ছিলেন আল গাযালি। মুসলমানরা যখন ধর্ম যুদ্ধ তরিকা, মাজহাব ইত্যাদি নিয়ে দ্বন্দ্বে লিপ্ত ছিলো তখন তিনি তাদেরকে বিশুদ্ধ ইসলামের অনাবিল শান্তির ছোঁয়ায় পুনঃআহ্বান জানান ।
প্রশ্নানুসারে দার্শনিকদের শ্রেণিবিভাগ নিম্নে আলোচনা করা হলো-
দার্শনিকবাদের শ্রেণিবিভাগ : সুনিশ্চিত সত্য ও জ্ঞান লাভের পূর্বে তৎকালীন দার্শনিক মতবাদের ব্যাখ্যা- বিশ্লেষণ করে গাযালি দার্শনিক সত্য অনুসন্ধানকারীদের চারটি সম্প্রদায়ে বিভক্ত করেন। যথা :-
১. ধর্মতাত্ত্বিক বা স্কলাস্টিক সম্প্রদায়
২. তালেমি বা ইসমাঈলি সম্প্রদায়
৩. সুফিসম্প্রদায়
৪. দার্শনিক বা ফালাসিফা সম্প্রদায়। উপরিউক্ত সম্প্রদায়গুলো সম্পর্কে নিম্নে আলোচনা করা হলো-
ধর্মতাত্ত্বিক বা স্কলাস্টিক সম্প্রদায় : গাযালির মতে, এরা ছিলেন রক্ষণশীল মনোভাবসম্পন্ন। যে কারণে তারা সত্য লাভের কোন গঠনমূলক মতবাদ প্রণয়ন করতে পারেননি। তারা মুতাজিলা চিন্তাবিদদের দার্শনিক যুক্তির বিপরীতে যুক্তি উপস্থাপন ভি করেন। শাস্ত্রীয় বিধান ও প্রচলিত ধর্মীয় মতে তাদের যুক্তিগুলো পুনরুল্লেখ মাত্র। গাযালির মতে জ্ঞানের একটি শাখা হিসেবে ধর্মতত্ত্বের যতই মূল্য দেওয়া হোক না কেন, এর মাধ্যমে অন কোনোভাবেই নিশ্চিত সত্য পাওয়া যায় না।
তালেমি বা ইসমাঈলি সম্প্রদায় : অনেকে তালেমি সম্প্রদায়কে কার্য ‘বাতেনি সম্প্রদায়’ বলেও আখ্যায়িত করেন। গাযালির সম্প্রদায় সম্পর্কে অনেকহীন ধারণা পোষণ করেন। প্রজ্ঞা শক্তিকে সম্পূর্ণ ফাল প্রত্যাখ্যান করে তালেমি চিন্তাবিদগণ অভিমত প্রকাশ করেন যে, দার্শ একজন ইমাম হচ্ছেন নির্ভুল ও সঠিক জ্ঞানের অধিকার তারা দার্শ একজন অভ্রান্ত ইমামকে স্বীকার করে নেন। ভালেমি সম্প্রদায়ের তা মতামতকে ইসলামি শরিয়ত বিরোধী মতামত বলে গাযালি কার্য তাদের মতামতকে বাতিল করে দেন।
সুফি সম্প্রদায় । সুফি সম্প্রদায়ের অতীন্দ্রিয় ভাব দ্বারা প্রভাবিত হয়েই গাযালি তাঁর জ্ঞান তাত্ত্বিক আলোচনায় সিদ্ধান্তে পৌঁছান যে, যথার্থ জ্ঞানের ক্ষেত্রে ইন্দ্রিয়ানুভূতি, বুদ্ধি বা প্রজ্ঞা কোনটাই অবদান নেই। এরপর গাযালি আধ্যাত্মিক অনুশীলনে মনোনিবেশ করেন এবং তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “ইহইয়া উল উলুম উদধীন” রচনা করেন।
দার্শনিক ও ফালাসিফা সম্প্রদায় : দার্শনিক ও ফালাসিফা সম্প্রদায় সমকালীন দার্শনিক মতবাদসমূহের মধ্যে গাযালির দৃষ্টি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ করেছে। গাযালি তাদের এই মতটিকে মেনে নিতে পারেননি যে, জ্ঞানের ক্ষেত্রে তারা প্রজ্ঞার অবদান -ও নিয়ে অনেক বাড়াবাড়ি করেন। গাযালির মতে বুদ্ধি বা প্রজ্ঞার লি মাধ্যমে সাধারণ জ্ঞান অর্জন সম্ভব হলেও এর মাধ্যমে চরম সত্য বা পরম সত্তার জ্ঞান অর্জন সম্ভব নয়। তিনি তাঁর “তাহফাতুল ফালাসিফা” বা দার্শনিকদের খণ্ডন’ এই বিখ্যাত গ্রন্থে দার্শনিকদের যুক্তি খণ্ডন করে দার্শনিকদের চারটি শ্রেণিভুক্ত করেন। যথা :
(ক) জড়বাদী; (খ) অতিবর্তী খোদাবাদী; (গ) খোদাবাদী ও (ঘ) সুফি সম্প্রদায়
উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, আল গাযালি কুরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলামকে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। ইসলামকে একটি শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছেন তিনি তাঁর ধর্মীয় ও জাগতিক জ্ঞান এবং নিখুঁত যুক্তি ও সুখবোধ্য লেখনীর মাধ্যমে। তিনি তাঁর লেখনীর মাধ্যমে ইসলামের মৌলিকত্ব অক্ষুণ্ণ রাখার প্রয়াস চালান। মুসলিম দর্শনে তাঁর বিভিন্ন অবদানের জন্য তাঁকে “হুজ্জাতুল ইসলাম’ বা ইসলামের রক্ষক বলা হয় ।