বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ রচনা ষষ্ঠ শ্রেণি
ভূমিকা: মুক্তিযুদ্ধ বলতে মুক্তির জন্য যে যুদ্ধ, তাকেই বোঝায়। ১৯৭১ সালে বাংলার মানুষ মুক্তিযুদ্ধ করে এবং ত্রিশ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জন করে স্বাধীনতার সোনালি সূর্য। বাঙালি জাতির ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ সবচেয়ে বড়ো রক্তক্ষয়ী ঘটনা। এ যুদ্ধে বিজয়ের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা আসে, জাতীয়তাবাদ ও সার্বভৌমত্ব গড়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি: ১৭৫৭ সালের ২০ জুন পলাশির যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হাসা দুইশ বছর ভারত উপমহাদেশ ইংরেজ দ্বারা শাসিত হয়। অতঃপর ১৯৪৭ সালে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ও পাকিস্তানের জন্ম হয় পাকিস্তান দুইটি অংশে বিভক্ত ছিল।
বর্তমান পাকিস্তানকে বলা হতো পশ্চিম পাকিস্তান এবং বাংলাদেশকে বলা হতো পূর্ব পাকিস্তান। নতুন রাষ্ট্রভুক্ত হওয়ার পর থেকেই পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের উপর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসন চালানো শুরু করে। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন এর অন্যতম প্রমাণ। 4′ আন্দোলনেই নিহিত ছিল আমাদের স্বাধীনতার বীজ।
এরপর ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচন, ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচন— এসব আন্দোলনের বিভিন্ন স্তর। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে বিজয়ী হলেও শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তর করেনি; বরং তারা পূর্ব পাকিস্তানের উপর আক্রমণ চালানোর গোপন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তানি হানাদাররা পূর্ব পাকিস্তানের নিরস্ত্র ও ঘুমন্ত মানুষের উপর হায়েনার মতো ঝাপিয়ে পড়ে।
অপারেশন সার্চলাইট ও স্বাধীনতা ঘোষণা: ১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে – | পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অতর্কিতে হামলা চালায় নিরস্ত্র বাঙালির উপর। ‘আপারেশন সার্চলাইট’ নামক এ সামরিক অভিযানে তারা নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ চালায় ইপিআর সদর দপ্তর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনস, ঢাকা | বিশ্ববিদ্যালয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এ ঘটনার পরপরই অর্থাৎ ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন’ এবং তা সারাদেশে প্রচারের নির্দেশ দেন। এর | পর হানাদার বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন তিনি।
শেখ মুজিবুর রহমান স্বাক্ষরিত ঘোষণা বার্তাটি চট্টগ্রাম বেতারকেন্দ্রের মাধ্যমে প্রচারের উদ্দেশ্যে তৎকালীন ইপিআর-এর ট্রান্সমিটার ব্যবহার করে প্রেরণ করা হয়। নিরাপত্তা ও কৌশলগত কারণে ঘোষণা বার্তাটি চট্টগ্রাম শহরের অদূরে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে প্রচারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ অভিযানের অংশ হিসেবে বেতারকেন্দ্রটির নামকরণ “স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী বেতারকেন্দ্র’ করা হয়।
এই কেন্দ্র থেকেই ২৬শে মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। সহযোগী নেতৃবৃন্দ ও বেতার কেন্দ্রের শব্দসৈনিকদের পরামর্শে ২৭শে মার্চ শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে পুনরায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন তিনি। এ ঘোষণার সংবাদ ক্রমান্বয়ে বিশ্ব গণমাধ্যমে বিশ্ব গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। সারা বাংলায় ছড়িয়ে পড়ে স্বতঃস্ফূর্ত মুক্তির সংগ্রাম।
নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ: ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার গঠন করা হয়। ১৭ এপ্রিল মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলার আম বাগানে এ সরকার শপথ গ্রহণ করে। সারা বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত হন জেনারেল আতাউল গণি ওসমানী।
দীর্ঘ নয় মাস ধরে চলা মুক্তিযুদ্ধে বাংলার মানুষ ব্যাপক সাহসী ভূমিকা রাখে। দেশের মানুষের উপর নির্মম নির্যাতন চালায় হানাদার পাকিস্তানি বাহিনী। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধাদের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তারা দিশাহারা হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে। প্রায় ত্রিশ লাখ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত হয় স্বাধীনতা।
মুক্তিযুদ্ধের চেতনা: মুক্তিযুদ্ধে জয়লাভের মধ্য দিয়ে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ নামক একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের জন্ম হয়। পরাধীন জীবন থেকে মুক্তি পেয়ে মানুষ নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। ত্রিশ লাখ প্রাণের বিনিময়ে বাংলার মানুষ প্রতিষ্ঠা করে এদেশের সার্বভৌমত্ব। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অসামান্য বীরত্বের সাক্ষী। আমাদের মাঝে এটি অধিকার আদায়ের চেতনা জাগিয়ে তোলে। দেশপ্রেমের অনুভূতির জাগরণ ঘটায়।
উপসংহার: ইংরেজদের হাতে বাংলার স্বাধীনতা হারানোর পর থেকেই বাংলার মানুষ স্বাধীনতা লাভের জন্য মরিয়া ছিল। ১৯৭১ সালে হারানো স্বাধীনতা পুনরুদ্ধার হয় বাংলার মানুষের ত্যাগের মধ্য দিয়ে। তাই মুক্তিযুদ্ধ আমাদের জাতীয় জীবনের সবচেয়ে বড়ো প্রেরণার নাম।






