ছাত্র জনতার অভ্যুত্থান ও নতুন বাংলাদেশ রচনা
ভূমিকা: বাংলাদেশের ইতিহাস অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ইতিহাস। এই চড়াইয়ের অগ্রভাগে সব সময় ছিল ছাত্র-জনতা। তারা কখনো ভাষার অধিকার, কখনো স্বাধীনতা, কখনো গণতন্ত্র, আবার কখনো ন্যায়ের দাবি নিয়ে রাজপথে নেমেছে। ইতিহাস সাক্ষী, যেখানেই অন্যায়, সেখানেই ছাত্র-জনতা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়েছে। ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৭১, ১৯৯০ এবং সাম্প্রতিক ২০২৪ সালের আন্দোলনগুলোই তার প্রমাণ।
রাষ্ট্রভাষার জন্য ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ: পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষাকে দমন করতে চেয়েছিল। ১৯৪৮ সালে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব দিলে বাঙালি ছাত্র-জনতা প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে এই আন্দোলন তীব্র আকার ধারণ করে।
২১ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় পুলিশ ছাত্রদের ওপর গুলি চালায়, শহিদ হন সালাম, বরকত, রফিক, জব্বারসহ অনেকে। তাদের এই রক্তের বিনিময়ে বাংলা ভাষা অর্জন করে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা। এই আন্দোলন ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার প্রথম সফল জাগরণ, যা পরবর্তী সব আন্দোলনের ভিত্তি তৈরি করে।
স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম: ১৯৬০-এর দশকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ববাংলাকে শোষণ করে চলছিল। রাজনৈতিক অধিকার, অর্থনৈতিক সমতা— কিছুই ছিল না। শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা দাবি তখন বাঙালির মুক্তির প্রতীক হয়ে ওঠে। ছাত্রসমাজ এগিয়ে আসে এগারো দফা কর্মসূচি নিয়ে।
১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে ছাত্রদের নেতৃত্বে শুরু হয় গণঅভ্যুত্থান। ২০ জানুয়ারি শহিদ আসাদের রক্তে আন্দোলন নতুন গতি পায়। এরপর একে একে ছাত্র-জনতা রাস্তায় নামে। তাদের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের ফলে আইয়ুব খানের স্বৈরশাসনের পতন ঘটে। এই আন্দোলনই পরবর্তীতে স্বাধীনতার দাবিকে আরও দৃঢ় করে তোলে।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আত্মত্যাগ: ১৯৭১ সালে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আবারও বাঙালির ওপর অন্যায় চাপিয়ে দেয়। ৭ মার্চ বঙ্গবন্দুর ঐতিহাসিক ভাষণে ছাত্র-জনতা স্বাধীনতার অঙ্গীকার করে। ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা নিরস্ত্র বাঙালির ওপর বর্বর হত্যাযজ্ঞ চালায়। তখন ছাত্র-জনতা আর চুপ করে থাকেনি। তারা অস্ত্র হাতে তুলে নেয় শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। বিশ্ববিদ্যালয়, গ্রাম, শহর সব জায়গা থেকে ছাত্ররা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। সাধারণ মানুষ তাদের খাদ্য, আশ্রয় ও সহায়তা দেয়। নয় মাসের যুদ্ধ শেষে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিজয় ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার সর্বোচ্চ ত্যাগের ফল।
গণতন্ত্রের পুনর্জাগরণ: স্বাধীনতার পরেও অন্যায়ের চক্র শেষ হয়নি। ১৯৮২ সালে জেনারেল এরশাদ সামরিকভাবে ক্ষমতা দখল করেন। সংবাদপত্রে সেন্সর, বিরোধী দল নিষিদ্ধ, মানুষের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ— সবই চলতে থাকে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রথম আওয়াজ তোলে ছাত্রসমাজ। বিভিন্ন কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৯০ সালে ছাত্রসংগঠনগুলো ঐক্যবদ্ধ হয়ে গড়ে তোলে ‘ছাত্র ঐক্য পরিষদ’। তাদের সঙ্গে যুক্ত হয় সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলগুলো। স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ এই স্লোগানে সারা দেশ জেগে ওঠে। ডিসেম্বর মাসে প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে এরশাদ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। ফিরে আসে গণতন্ত্র। এই আন্দোলন আবারও প্রমাণ করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্র- জনতা এক হলে কোনো স্বৈরশাসক টিকতে পারে না।
ন্যায়ের নতুন যুগঃ ডিজিটাল যুগের বাংলাদেশেও অন্যায়, দুর্নীতি ও বৈষম্য পুরোপুরি শেষ হয়নি। ২০২৪ সালে দেশের তরুণ প্রজন্ম আবারও নেমে “আসে রাস্তার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এবং শিক্ষাঙ্গনে। তাদের দাবি ছিল সরকারি চাকরিতে নিয়োগে স্বচ্ছতা, শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার, দুর্নীতির অবসান এবং সকলের জন্য ন্যায়বিচার। এই আন্দোলনে যুক্ত হয় শিক্ষক, অভিভাবক, শ্রমিক এবং দেশব্যাপী সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ। ছাত্র-জনতার এই ঐক্য আধুনিক পদ্ধতিতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নতুন ধারা তৈরি করে। এই প্রজন্ম দেখিয়েছে, সময় পাল্টে গেলেও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর চেতনা কখনো ফুরিয়ে যায় না।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক ভূমিকা: বাংলাদেশের ইতিহাসে ছাত্রসমাজ কেবল শিক্ষার্থী নয়, তারা জাতির বিবেক। তাদের ন্যায় সাত আন্দোলনে সব সময় জনতা যুক্ত হয়েছে। তাদের প্রতিবাদী কন্ঠস্বর। সর্বকালেই স্বৈরশাসকের প্রাসাদকে প্রকম্পিত করেছে। একসঙ্গে তারা তৈরি করেছে পরিবর্তনের ঢেউ।
তাদের ভূমিকা তিনভাবে দেখা যায়—
১. সচেতনতার সঞ্চার; ছাত্ররা সমাজে অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষের সচেতনতা বাড়ায়।
২. প্রতিরোধের নেতৃত্ব; তারা প্রথম রাজপথে নামে, প্রতিবাদের মশাল জ্বালে। ৩. ন্যায় প্রতিষ্ঠা; তাদের ত্যাগ ও নেতৃত্বেই সমাজে ন্যায়ের আলো ছড়ায়। তাই ১৯৫২ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত প্রতিটি আন্দোলনই ছাত্র-জনতার ঐক্যের সোনালি অধ্যায়।
শিক্ষণীয় দিক; অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার ইতিহাস আমাদের শেখায় অন্যায় চুপ করে মেনে নেওয়া যায় না। ন্যায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ হওয়াই প্রকৃত শক্তি। তরুণ প্রজন্ম দেশের ভবিষ্যৎ তাদের দায়িত্ব সমাজে ন্যায়ের আলো জ্বালানো। রক্ত ও ত্যাগ কখনো বৃথা যায় না তা পরবর্তী প্রজন্মের প্রেরণা হয়ে থাকে।
উপসংহার: বাংলাদেশের ইতিহাসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছাত্র-জনতার অবদান অনস্বীকার্য। ভাষার অধিকার থেকে শুরু করে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার — সব অর্জনের পেছনে রয়েছে তাদের সাহস, ত্যাগ ও ঐক্য।






