ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ১ম পত্র ২য় অধ্যায় সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর খুঁজছেন? এই পোস্টে এইচএসসি শিক্ষার্থীদের জন্য ২য় অধ্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ সৃজনশীল (CQ) প্রশ্ন ও নির্ভুল সহজ ভাবে উত্তর একসাথে তুলে করা হয়েছে।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ১ম পত্র ২য় অধ্যায় সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর
এই অধ্যায়ে ইসলামি সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিভিন্ন দিক আলোচনা করা হয়েছে যা পরীক্ষার সৃজনশীল প্রশ্নে প্রায়ই আসে। তাই পরীক্ষার প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করতে এখানে দেওয়া ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি ১ম পত্র ২য় অধ্যায় সৃজনশীল প্রশ্ন উত্তর গুলো অনুশীলন করলে আপনি সহজেই ভালো নম্বর অর্জন করতে পারবেন।
সৃজনশীল প্রশ্ন-১
জাওয়াদ ও জারিফ দুই ভাই একত্রে বসে একজন মহামনীষীর শৈশব নিয়ে আলোচনা করছিল। তাদের দুজনের আলোচনার মধ্যে তাদের বাবা উপস্থিত হন। তিনি প্রসঙ্গক্রমে বলেন, ছোটবেলা থেকেই তার চরিত্রে অসংখ্য সদগুণের সমাবেশ ঘটেছিল। তিনি সর্বদা সত্য কথা বলতেন। কখনো অন্যায় আচরণ করেননি। তাই তিনি সবার শ্রদ্ধার পাত্র ছিলেন। সবাই তাকে “আল-আমিন’ বা বিশ্বাসী বলে ডাকত।
ক. উকাজ মেলা কোথায় বসত?
খ. মদিনা সনদ বলতে কী বোঝ?
গ. উদ্দীপকে উল্লেখিত জাওয়াদ ও জারিফের বাবার সর্বশেষ বক্তব্যটি ব্যাখ্যা কর।
ঘ. তুমি কি মনে কর, উদ্দীপকের আলোচিত ব্যক্তির চরিত্রে অসংখ্য সদগুণের সমাবেশ ঘটেছিল? তোমার মতের পক্ষে যুক্তি দাও।
সৃজনশীল উত্তর ০১
ক. মক্কার নিকটবর্তী উকাজ নামক স্থানে উকাজ মেলা বসত।
খ. ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে হিজরতের পর মদিনার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্য ও সম্ভাব প্রতিষ্ঠা করার মানসে হজরত মুহম্মদ (স.) একটি ইসলামি প্রজাতন্ত্র স্থাপনের সংকল্প করেন। তাই মদিনার আউস ও খাযরাজ গোত্রদ্বয়কে একতা ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ ও অমুসলমান সম্প্রদায়ের মধ্যে ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ভিত্তিতে সহনশীলতার মনোভাব গড়ে তোলার জন্য তিনি ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে একটি শাসনতন্ত্র প্রণয়ন করেন, এটিই ঐতিহাসিক মদিনা সনদ। ‘সিরাতে ইবনে হিশাম গ্রন্থানুসারে মদিনা সনদের ৪৭টি ধারা ছিল। এটি ছিল বিশ্বের ঐতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান। আধুনিক ঐতিহাসিকগণ এটিকে ‘আরবের ম্যাগনাকার্টা’ বলে অভিহিত করেছেন।
মূলকথা : ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে মদিনায় বসবাসকারী সকল গোত্রের মধ্যে সমতা ও ঐক্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মদিনা সনদ প্রণয়ন করা হয়েছিল।
গ. উদ্দীপকে জাওয়াদ ও জারিফের বাবার সর্বশেষ বক্তব্যটি ছিল- সবাই মহানবি (স.)কে আল-আমিন বা বিশ্বাসী বলে ডাকত। নিচে উক্তিটি ব্যাখ্যা করা হলো-
মহানবি হজরত মুহম্মদ (স.) হলেন বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ আদর্শ মহামানব। তাঁর চরিত্র সব মানুষের জন্য একটি উত্তম অনুকরনীয় আদর্শ। তাঁর চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ ছিল সত্যবাদিতা। তিনি বাল্যকাল থেকেই মিথ্যা, বঞ্চনা ও প্রতারককে ঘৃণা করতেন। তার মন ছিল খুবই সংবেদনশীল। নম্রতা, বিনয়, সত্যবাদিতা, সৎস্বভাব ছিল তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। কর্তব্যনিষ্ঠা, চারিত্রিক নির্মলতা, পবিত্রতা, সত্যের প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগ তাঁর মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে। তিনি জীবনে কখনোই অসত্য, প্রতারণা ও প্রবঞ্চনার আশ্রয় গ্রহণ করেননি । প্রতিশ্রুতি রক্ষায় তিনি ছিলেন তৎপর। এ কারণে তাঁর প্রতি
মক্কার কুরাইশদের যথেষ্ট আস্থা ছিল। তাঁর প্রতি অগ বিশ্বাস থাকার কারণে মক্কার লোকেরা তাঁর কাছে ধন-সম্পদ আমানত রাখত। এসব কারণে অল্প বয়সেই তিনি আল ‘আমিন’ বা বিশ্বাসী উপাধি লাভ করেছিলেন।
মূলকথা : সত্যবাদিতা, কর্তব্যনিষ্ঠা, সরলতা, বিশ্বস্ততার জন্য তাঁকে আল-আমিন নামে অভিহিত করা হয়।
ঘ. হ্যাঁ, আমি মনে করি মহানবি (স.)-এর চরিত্রে অসংখ্য সদগুণাবলির সমাবেশ ঘটেছিল; নিচে আমার মতের পক্ষে যুক্তি দেখানো হলো-
১। আল্লাহর উপর প্রগাঢ় বিশ্বাস : মহানবি (স.) একজন একনিষ্ঠ বিশ্বাসী হিসেবে আল্লাহর মনোনীত ধর্ম ইসলামের জন্য কাফিরদের নানা অত্যাচার সহ্য করলেও আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস হারাননি। আল্লাহর প্রতি প্রগাঢ় বিশ্বাসী হওয়ার জন্য তিনি নিঃস্ব ও রিক্তহস্তে মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন। এবং স্বল্পসংখ্যক মুসলমানকে নিয়ে বিভিন্ন যুদ্ধে কুরাইশ ও বিধর্মীদের বিরুদ্ধে বিজয়ী হন ।
২। সত্যবাদিতা : সত্যবাদিতা ছিল মহানবি (স.)-এর চরিত্রের অন্যতম শ্রেষ্ঠ গুণ। তিনি বাল্যকাল থেকেই মিথ্যা, বঞ্চনা ও প্রতারণাকে ঘৃণা করতেন; ফলে অল্প বয়সেই তিনি ‘আল- আমিন’ বা বিশ্বাসী উপাধি পেয়েছিলেন।
৩। বিনয়ী ও নম্র : মহানবি (স.) ছিলেন নম্রতা ও বিনয়ের অমর প্রতীক। তিনি কোনো দিন কাউকে আঘাত দিয়ে কথা বলেননি; চরম শত্রুদের সাথেও তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে কথা বলতেন এবং কেউ তাঁর ক্ষতি করলেও তাকে ক্ষমা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন।
৪। ক্ষমাশীল : মহানবি (স.) ছিলেন ক্ষমার মূর্তপ্রতীক; প্রাণঘাতী দুশমনকেও তিনি ক্ষমা করতে দ্বিধাবোধ করেননি। মক্কা ও তায়েফ বিজয়ের সময় তিনি যে ক্ষমার আদর্শ দেখান বিশ্বের ইতিহাসে এমন দৃষ্টান্ত নেই ।
৫। শান্তিপ্রিয় : শৈশব থেকেই মহানবি (স.) একজন শান্তিপ্রিয় মানুষ ছিলেন; যুদ্ধের হানাহানি, ঝগড়া-বিবাদ তাঁর হৃদয়কে ব্যথিত করত। তিনি একজন শান্তিকামী মানুষ হিসেবে সর্বদাই অসহায়, নির্যাতিত, নিপীড়িত ব্যক্তিদের পক্ষে কাজ করেছেন।
৬। ন্যায়পরায়ণতা : ন্যায়পরায়ণতা ছিল মহানবি (স.)-এর অত্যুজ্জ্বল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য; তিনি সর্বদা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়পরায়ণতার পরাকাষ্ঠা ব্যক্তি ছিলেন।
৭। ওয়াদা পালন ; ওয়াদা পূরণ মহানবি (স.)-এর চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, প্রতিশ্রুতি পালন না করাকে তিনি জঘন্যতম পাপ বলে অভিহিত করেন । সুতরাং বলা যায়, মহানবি (স.) ছিলেন অসংখ্য সদগুণাবলির অধিকারী
মূলকথা : মহানবি (স.)-এর চরিত্রে অসংখ্য সদগুণের সমাবেশ ঘটেছিল।
সৃজনশীল প্রশ্ন-৩।
নিসাব পরিমাণ সম্পদকে সহিহ ও বিশুদ্ধ রাখার ব্যবস্থা আছে ইসলামে। সম্পদের সুষ্ঠু বণ্টনে আল্লাহ তায়ালাও সন্তুষ্ট হন। সুষ্ঠু অর্থ বণ্টনের মাধ্যমে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভ করা যায়। ‘X’ নামের আল্লাহর বান্দা বেশ কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার করে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করেন।
ক. গনিমত থেকে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে কী পরিমাণ জমা রাখার বিধান আছে?
খ. মহানবি (স.)-এর শিক্ষা সংস্কার লেখ।
গ. ‘X’ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রীয় কোষাগার সম্পর্কে পাঠ্যবইয়ের আলোকে ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকে বর্ণিত ‘x’-এর অর্থনৈতিক সংস্কারের আলোকে পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত মহান ব্যক্তির অর্থনৈতিক সংস্কার আলোচনা কর।
সৃজনশীল উত্তর ০৩
ক. ১ এর ৫ অংশ।
খ. অজ্ঞতার যুগে মহানবি (স.) শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করেন। তিনি ঘোষণা করেন, “জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক নর- নারীর জন্য ফরজ। জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন হলে সুদূর চীন দেশে যাও।” তিনি আরও বলেন, পণ্ডিতগণের কলমের কালি শহিদের রক্তের চেয়েও অধিক পবিত্র। মসজিদ-ই-নববী ছিল তাঁর প্রথম শিক্ষালয়।
মূলকথা : মহানবি (স.)-এর শিক্ষা সংস্কারের ফলে মুসলিম জাতি অল্পদিনের মধ্যে বিশ্বের শিক্ষক হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।
গ. উদ্দীপকে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বলতে মহানবি (স.) প্রতিষ্ঠিত বায়তুল মালকে বোঝানো হয়েছে। বায়তুল মালের অর্থ খলিফার নিদের্শমতো যুদ্ধকাজে, কর্মচারীদের বেতন, পেনশন, ভাতা ও অন্য রাষ্ট্রপ্রধানদের উপঢৌকন প্রেরণের কাজে ব্যবহৃত হতো। এছাড়া বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক কাজ; যেমন- রাস্তাঘাট, সেতু, মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ, এতিম ও দরিদ্রদের সাহায্য দানের জন্য ব্যয় করা হতো।
পরবর্তীতে খোলাফায়ে রাশেদিনের খলিফাগণ বায়তুল মাল থেকে শুধু নির্ধারিত ভাতা ভোগ করতেন। মহানবি (স.) রাষ্ট্রীয় কোষাগার প্রতিষ্ঠা করেছেন; যা কাজ পরবর্তীতে বায়তুল মাল’ নামে পরিচিত হয়। বায়তুল মাল ) ছিল যেমন রাষ্ট্রের তেমনি জনসাধারণের সম্পদ। ওশর, খারাজ বা ভূমিরাজস্ব, জাকাত, সাদকা, গনিমত, আল-ফে, আল-উশর, ওয়াকফ এসব খাত থেকে বিধিবদ্ধ উপায়ে সম্পদা সংগৃহীত হয়ে বায়তুল মালে জমা হতো ও বিলিবণ্টন হতো।
মহানবি (স.) বায়তুল মাল প্রতিষ্ঠা করার পর জনগণের সম্পদের একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ বায়তুল মালে জমা হতো। ফলে এ অর্থ দুঃসময়ে গরিবদের মাঝে বণ্টন করা হতো। তাই বায়তুল মাল ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
মূলকথা : বায়তুল মাল বা রাষ্ট্রীয় কোষাগার প্রতিষ্ঠা মহানবি (স.)- এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
ঘ. উদ্দীপকে বর্ণিত ‘X’ -এর অর্থনৈতিক সংস্কারের সাথে পাঠ্যপুস্তকে বর্ণিত মহান ব্যক্তি মহানবি (স.)-এর অর্থনৈতিক সংস্কার আলোচনা করা হলো- মহানবি (স.) সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থার মাধ্যমে আরবে অনেক অর্থনৈতিক সংস্কার করেছেন। সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থার অভাবে সমগ্র আরব উপদ্বীপ ছিল অর্থনৈতিক দিক থেকে পঙ্গু। কারণ, সমগ্র আরব উপদ্বীপ ছিল অনুর্বর পর্বতময়।
হজরত মুহম্মদ (স.) দীর্ঘ ২৩ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে অর্থনৈতিক বৈষম্য, সুদ, ঘুষপূর্ণ অর্থব্যবস্থাকে ইসলামি শরিয়ত অনুযায়ী চালু করেন। মহানবি (স.) সুষ্ঠু অর্থব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য রাজস্ব ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। যথা- জাকাত, জিজিয়া, খারাজ, আল-ফে গনিমত ইত্যাদি। মহানবির প্রবর্তিত অর্থব্যবস্থা মানব জাতির অর্থনৈতিক মুক্তির একমাত্র পথ । জাকাত : সোনা, রুপা, ভেড়া, গরু, মহিষের উপর জাকাত ধার্য করা হতো। জিজিয়া : জিজিয়া হলো রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিকদের নিরাপত্তা কর। এ অর্থ সামরিক খাতে ব্যয় করা হতো।
খারাজ : অমুসলিম প্রজাদের ভূমি কর। ধনী অমুসলিম প্রজারা এ কর প্রদান করত। আল-গানিমাত : যুদ্ধলব্ধ দ্রব্যাদি সৈন্যদের মধ্যে অংশ ও অবশিষ্ট অংশ রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা হতো। আল-ফে: রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে আয়। মহানবি (স.) ধনীদের উপর জাকাত ও জিজিয়া ধার্য করে গরিবদের মধ্যে তা বণ্টন করেছেন। ফলে ধনী-দরিদ্রের প্রভেদ কমতে থাকে। পরিশেষে বলা যায় যে, মহানবি (স.)-এর অর্থনৈতিক সংস্কার ইসলামের ইতিহাসে অনেক তাৎপর্যপূর্ণ ।
মূলকথা : মহানবি (স.) দীর্ঘ ২৩ বছর অক্লান্ত পরিশ্রম করে অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করেন ।
সৃজনশীল প্রশ্ন-৪।
মারুফ বিজ্ঞান বিভাগে একাদশ শ্রেণিতে পড়ে। পত্রিকায় বাংলাদেশের সংবিধান সংশোধনবিষয়ক একটি খবর দেখে সে তার বড় ভাই কাদেরের কাছে জানতে চাইল, সংবিধান কী? কাদের তাকে বলল, রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য মৌলিক কিছু নীতিমালা প্রয়োজন, যা লিখিত বা অলিখিত থাকতে পারে। হজরত মুহম্মদ (স.) সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান প্রণয়ন করেছিলেন।
ক. হজরত মুহম্মদ (স.) কখন এবং কোথায় জন্মগ্রহণ করেন?
খ. হজরত মুহম্মদ (স.)-কে ‘আল-আমিন’ বলা হতো কেন?
গ. উদ্দীপকের বিষয়টিতে মহানবির জীবনের কোন ঘটনার প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে, ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকে উল্লেখিত প্রথম লিখিত সংবিধানের তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।
উত্তর
ক. হজরত মুহম্মদ (স.) ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে মক্কায় জন্মগ্রহণ করেন।
খ. বাল্যকাল থেকেই হজরত মুহম্মদ (স.) ছিলেন, সত্যবাদী। নম্রতা, বিনয় ও সৎ স্বভাবের জন্য সবাই তাঁকে শ্রদ্ধা করত। তাঁর অপরিসীম কর্তব্যনিষ্ঠা, চারিত্রিক নির্মলতা ও পবিত্রতায় সবাই তাঁর প্রতি মুগ্ধ ছিল। সত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ আরববাসীকে বিমোহিত করেছিল। এত সব গুণের কারণে আরববাসী বাল্যকালেই তাঁকে আল-আমিন বা বিশ্বাসী উপাধি প্রদান করেছিল।
মূলকথা : সত্যবাদিতা, বিনয়, সৎ স্বভাব ইত্যাদি কারণে মুহম্মদ (স.)-কে আরবের লোকেরা আল-আমিন বলে ডাকত।
গ. উদ্দীপকের বিষয়টি মহানবি (স.)-এর মদিনা সনদের প্রতি ইঙ্গিত করে। মদিনা সনদ ছিল বিশ্বের ইতিহাসে প্রথম লিখিত সংবিধান। বিষয়টি নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-
হজরত মুহম্মদ (স.) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দ মক্কা থেকে ইয়াসরিবে হিজরত করার পর বেশ কিছু সমস্যার সম্মুখীন হন।
রাসুল (স.) অনুভব করেন যে, মক্কার মুহাজির আর স্থানীয় ইয়াসরিববাসীদের মধ্যে দায়িত্ব ও কর্তব্যের একটি সীমারেখা টানা প্রয়োজন। মুহাজিররা কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবেন তার ব্যবস্থা থাকা দরকার। কুরাইশদের হাতে ক্ষতিগ্রস্ত মুহাজিরদের ক্ষতিপূরণ কীভাবে হবে এর সুরাহা হওয়া প্রয়োজন। মদিনার অমুসলিম ইহুদিদের সাথে মুসলমানদের সুসম্পর্ক সৃষ্টি কীভাবে হতে পারে, তার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
মদিনার রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক রাষ্ট্রীয় রূপরেখা এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সুদৃঢ় করা প্রয়োজন । ইসলাম ধর্মের প্রচার ও প্রসার এবং মুসলিম জাতির ভবিষ্যৎ ও অগ্রযাত্রার পথ তৈরি করা প্রয়োজন। এসব বিষয় সন্নিবেশ করে রাসুল (স.) ইয়াসরিবের পৌত্তলিক, ইহুদি, আনসার ও মুহাজিরদের জন্য বিশ্বের ইতিহাসের প্রথম সংবিধান প্রণয়ন করেন। এরই নাম ‘মদিনা সনদ’।
মূলকথা : মদিনা সনদের প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে।
ঘ. উদ্দীপকে উল্লেখিত প্রথম লিখিত সংবিধান হচ্ছে মদিনা সনদ । নিচে মদিনা সনদের তাৎপর্য বিশ্লেষণ করা হলো- মদিনা সনদ পৃথিবীর ইতিহাসে সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান। ইতিপূর্বে শাসকের ঘোষিত আদেশই ছিল আইন।
মহানবি (স.) সর্বপ্রথম জনগণের মঙ্গলার্থে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করেন। রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থায় দেশের সব সম্প্রদায় ও জনগণের আন্তরিক সহযোগিতার প্রয়োজন অনুভব করে তিনি সবার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেন। মদিনার সনদে সাম্যের মহান নীতি, আইনের শাসন, ধর্মের স্বাধীনতা ও সহিষ্ণুতা এবং সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা থাকায় এই সনদকে মহাসনদ (Magna Carta) বলা হয়।
এই সনদের মাধ্যমে মুসলমান ও অমুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের সম্পর্ক স্থাপিত হয়। বিপদের সময় একে অপরকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত হয় এই সনদে। মদিনা রাষ্ট্র তথা ইসলামি প্রজাতন্ত্র সংরক্ষণে সবার সমভাবে যুদ্ধ ব্যয় বহন করার ব্যবস্থা মুহম্মদ (স.)- এর রাজনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচায়ক। পূর্বের শেখতন্ত্রের পরিবর্তে এই সনদে আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়। মদিনার সনদের মাধ্যমে মদিনায় ইসলামি রাষ্ট্র সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং যুদ্ধবিধ্বস্ত মদিনা নগরীর পুনর্গঠন ও পরবর্তীতে নির্বিঘ্নে দূরদেশে ইসলামের প্রসারে রাসুল (স.) আত্মনিয়োগ করার সুযোগ পান ।
সৃজনশীল প্রশ্ন-৫।
মুক্তিযুদ্ধের সময় রাশেদদের গ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা গ্রামে প্রবেশের রাস্তা কেটে দিয়েছিল, যাতে পাকিস্তানি আর্মি সহজে গ্রামে প্রবেশ করতে না পারে। রাস্তা কাটা থাকায় পাক আর্মি গাড়ি ছাড়া পায়ে হেঁটে গ্রামে প্রবেশ করার সাহস পায়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের এ রণকৌশলের কারণে রাশেদদের গ্রাম ছিল নিরাপদ ও মুক্তিযোদ্ধাদের একটি ঘাঁটি।
ক. কুশাই কত খ্রিষ্টাব্দে মারা যান?
খ. খন্দকের যুদ্ধে ইহুদিরা কেন কুরাইশদের উস্কানি দিয়েছিল?
গ. উদ্দীপকের অনুরূপ রণকৌশল মহানবি (স.) কোন যুদ্ধে প্রয়োগ করেছিলেন? বর্ণনা কর ।
ঘ. মহানবি (স.)-এর উক্ত রণকৌশলটির তাৎপর্য বিশ্লেষণ কর।
সৃজনশীল উত্তর ০৫
ক. কশাই ৪৮০ খ্রিষ্টাব্দে মারা যান।
খ. উহুদ যুদ্ধের পর মদিনা থেকে বানু নাজির গোত্রের ইহুদিদের বহিষ্কার করা হয়েছিল। তারা খাইবারের ওয়াদিউল কুরা ও সিরিয়ার বাণিজ্যপথে এবং অন্যান্য জায়গায় বসতি স্থাপন করল। তাদের প্ররোচনায় প্রভাবিত হয়ে সব ইহুদি গোত্রই মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হলো।
উপরন্তু তারা মক্কার কুরাইশদের মদিনা পুনরাক্রমণের জন্য অনবরত উত্তেজিত করতে থাকে। মদিনা থেকে বানু নাজির গোত্রের বহিষ্কৃত হওয়াই ছিল এর মূল কারণ।
মূলকথা : বানু নাজির গোত্রের ইহুদিদের মদিনা থেকে বহিষ্কার করার কারণে ।
গ. উদ্দীপকে রাশেদদের গ্রামের মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি সৈন্যদের গ্রামে ঢুকতে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে রাস্তা কেটে দিয়েছিল। ফলে পাক আর্মি গ্রামে ঢুকতে পারেনি। এটি যেন খন্দকের যুদ্ধেরই প্রতিচ্ছবি ।
৬২৭ খ্রিষ্টাব্দে আবু সুফিয়ান ইহুদি ও বেদুঈনদের একটি সম্মিলিত বাহিনীর ১০,০০০ সৈন্যসহ মদিনার দিকে অগ্রসর হয়। মহানবি (স.) ৩,০০০ সৈন্য সংগ্রহ করে এ সম্মিলিত বাহিনীকে প্রতিরোধ করার উপায় উদ্ভাবনের লক্ষ্যে পরামর্শ সভা আহ্বান করেন। সভায় অনেকে অনেক প্রস্তাব দেন, কিন্তু গৃহীত হয় পারস্যবাসী সালমান ফারসির পরামর্শ। তিনি পরামর্শ দেন যে, মদিনার চতুর্দিকে অরক্ষিত স্থানে পরিখা খনন করা হোক।
এ প্রস্তাব গৃহীত হলে মহানবি (স.)-এর উপস্থিতিতে মদিনার চারদিকে অরক্ষিত স্থানে পরিখা খনন করা হলো। এই পরিখা বা খন্দক থেকেই এ যুদ্ধের নামকরণ করা হয় পরিখা বা খন্দকের যুদ্ধ। যা হোক, কাফিরদের সম্মিলিত বাহিনী এই পরিখা অতিক্রম করে মদিনায় প্রবেশ করতে সাহস পায়নি। তিন সপ্তাহের অধিককাল মদিনা অবরোধ করে অবশেষে তারা রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হয় । (i) মূলকথা : অনুরূপ কৌশল মহানবি (স.) খন্দকের যুদ্ধে প্রয়োগ করেছিলেন।
ঘ. উহুদের যুদ্ধের পরাজয়ের গ্লানি পরিখার যুদ্ধের মাধ্যমে মুসলমানগণ দূর করতে সক্ষম হন। এ যুদ্ধে বেদুঈন, ইহুদি ও বিধর্মী কুরাইশদের সম্মিলিত শক্তি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, ফলে ইসলামের মর্যাদা সুপ্রতিষ্ঠিত হয়। এস.এ. ইমামুদ্দিনের মতে, “সম্মিলিত বাহিনীর ভাঙনের ফলে মক্কাবাসীর সম্পূর্ণ পরাজয় প্রতিভাত হয়ে ওঠে এবং মদিনায় মুসলিম রাষ্ট্রের ভিত্তিমূল সুদৃঢ় হয়।
অল্প সময়ের মধ্যে ইসলাম সমগ্র আরব দেশ এমনকি পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে বিস্তার লাভ করে।” পরিখার যুদ্ধের গুরুত্ব বিচারে জোসেফ হেল বলেন, “পরিখার যুদ্ধের ফলাফল ছিল সংখ্যাধিক্য শক্তির উপর শৃঙ্খলা ও একতার নব বিজয়।” এর ফলে ইসলামের মর্যাদা বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।
উহুদের যুদ্ধে যে কারণে মুসলমানগণ পরাজয় বরণ করেন এর পুনরাবৃত্তি হলে পরিখার যুদ্ধে ইসলাম ধ্বংসপ্রাপ্ত হতো। পরিখার যুদ্ধে জয়লাভের ফলে ইসলামের শক্তি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর প্রভাব বিভিন্ন গোত্রের উপর বিস্তৃতি লাভ করে। ইসলাম প্রচারে রাষ্ট্রের আধিপত্য বৃদ্ধি পায় এবং তা সর্বজনীন রূপ লাভ করে।
মূলকথা : পরিখার যুদ্ধের ফলে ইসলামি রাষ্ট্রের আধিপত্য সুপ্রতিষ্ঠিত হয়।
সৃজনশীল প্রশ্ন-৬।
ফিরদাউস সাহেব একজন কলেজ শিক্ষক। শিক্ষকতার পাশাপাশি ইসলামের সুমহান আদর্শ সমাজে বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছেন । আস্তে আস্তে তাঁর কথায় এলাকার অধিকাংশ মানুষ ইসলামি আদর্শ ধারণ করছে। এ পরিস্থিতি ইসলামবিদ্বেষীদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াল। তারা ফিরদাউস সাহেবকে এ কাজ থেকে বিরত থাকতে বললেও কোনো লাভ হলো না। ফলে তারা তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করল। এ সংবাদ জানতে পেরে ফিরদাউস সাহেব নিজ বিছানায় তাঁর চাচাতো ভাইকে রেখে তাঁর এক সাথিকে নিয়ে অন্যত্র চলে গেলেন ।
ক. আকাবার শপথ কয়টি?
খ. কুরাইশদের কাছে ইসলাম প্রচার করে মহানবি (স.) নিরাশ হলেন কেন?
গ. ফিরদাউস সাহেবের ঘটনাটি পাঠ্যবইয়ের আলোকে বিশ্লেষণ কর।
ঘ. উদ্দীপকের ঘটনার আলোকে বর্তমান প্রেক্ষাপটে হিজরতের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে মতামত দাও।
সৃজনশীল উত্তর ০৬
ক. আকাবার শপথ তিনটি
খ. মহানবি (স.) নবুয়ত লাভের পর বিভিন্নভাবে কুরাইশদের কাছে ইসলাম প্রচার করে হতাশ হলেন । কারণ, মহানবি (স.) তাদের পাপাচার, নির্যাতন, ব্যভিচার ও মদ্যপান প্রভৃতি অনৈতিক কর্মকাণ্ড ত্যাগ করে নির্মল, নিষ্কলুষ, সৎ, সহজ-সরল, অনাড়ম্বর জীবনযাপনে প্রেরণা জোগান।
মহানবির এ বাণী কুরাইশদের হৃদয় ধারণ করতে পারেনি। তাই তারা গ্রহণ করেনি। উপরন্তু তারা মহানবি (স.)-এর কুৎসা রটনা করত, নানাবিধ সমস্যা সৃষ্টি করত, মুসলমানদের প্রতি নির্যাতন চালাত । এসব কারণে মহানবি (স.) তাদের কাছে ইসলাম প্রচারে নিরাশ হয়ে পড়েন ।
মূলকথা : আল্লাহর প্রতি কুরাইশদের অবিশ্বাস ও মুসলমানদের নির্যাতনে মহানবি (স.) নিরাশ হয়ে পড়েন।
গ. উদ্দীপকে ফিরদাউস সাহেবের ঘটনাটিতে মহানবির মদিনা হিজরতের কারণ ফুটে ওঠে। নিচে পাঠ্যবইয়ের আলোকে তা বিশ্লেষণ করা হলো— ঐতিহাসিক মন্টোগোমারি ওয়াট (Montogumory Watt) বলেন, “উষ্ণ, রুক্ষ আবহাওয়ার কারণেই মক্কাবাসীদের মন- মেজাজ উগ্র, কঠোর ও কলহপ্রিয় ছিল। অন্যদিকে শস্য-শ্যামল মদিনার জনগণ শান্ত ও চিন্তাশীল ছিল। তাই মক্কা অপেক্ষা মদিনায় ইসলাম প্রচারে অনুকূল পরিবেশ ছিল। এ কারণে মহানবি (স.) মদিনায় হিজরত করেন।”
ইসলামের প্রসারে চিন্তিত হয়ে কুরাইশরা রাসুল (স.)-এর উপর নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। সবশেষে কুরাইশরা রাসুল (স.)-কে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। তাই মহান আল্লাহ তায়ালা মহানবি (স.)-কে মদিনা হিজরতের নির্দেশ দেন। এ দিকে, ৬২০, ৬২১ ও ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মদিনার ৩টি কাফেলা আকাবার শপথের মাধ্যমে রাসুল (স.)-কে মদিনায় হিজরত করার আমন্ত্রণ জানায়। ফলে মহানবি (স.) ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করেন।
পরিশেষে বলা যায়, ইসলামের প্রসারতা মদিনা হিজরতের মাধ্যমেই পরিপূর্ণতা লাভ করে। ঐতিহাসিক জোসেফ হেল বলেন, “হিজরত ইসলামের ইতিহাসে মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা।”
মূলকথা : সকল অপমান ও লাঞ্ছনার অবসান ঘটিয়ে মহান আল্লাহর নির্দেশে ইসলাম প্রচারে মহানবি (স.) মদিনায় হিজরত করেন।
ঘ. উদ্দীপকের ঘটনাটি মহানবি হজরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনে ঘটে যাওয়া মদিনা হিজরতের প্রতিচ্ছিবি। মহানবি (স.) যে প্রেক্ষাপটে হিজরত করেছিলেন তা শুধু ইসলাম প্রচারের স্বার্থে। সে প্রেক্ষাপট বর্তমানে উপস্থিত হলে হিজরত করা যাবে। যথা:
(১) ইসলামের বিকৃতি হতে রক্ষার জন্য;
(২) জীবন বাঁচানোর জন্য;
(৩) সম্পদ রক্ষার জন্য;
(৪) মুসলমানদের ক্যাপী অস্তিত্ব রক্ষার জন্য;
(৫) ইসলাম প্রচারের জন্য;
(৬) ইসলাম
সম্পর্কে জ্ঞানলাভের উদ্দেশ্যে। মহানবি (স.) যে সব কারণে হিজরত করেছিলেন বর্তমানে ১ না থাকলেও আংশিক কারণ বিদ্যমান। যেমন : রোহিঙ্গা সম্প্রদায়, ফিলিপাইনের আবু সায়াফ সম্প্রদায়, ইরা অনিরাপদ স্থানের মুসলমানরা, ফিলিস্তিনে ইসরা আগ্রাসনের শিকার মুসলমানরা হিজরত করতে পারবে। ম (স.) বলেছেন, “হিজরত কিয়ামত পর্যন্ত অবশিষ্ট থাকবে সুতরাং, ইসলাম ও মুসলমানদের জীবন রক্ষার জন্য বর্তম প্রেক্ষাপটে হিজরত করা যাবে।
মূলকথা : ইসলাম, সম্পদ, জীবন রক্ষার্থে হিজরত করা যাবে।
সৃজনশীল প্রশ্ন-৭।
ইসলামের ইতিহাস ক্লাসে শিক্ষক সাজেদুল ইসলাম বিখ্যাত ব্যক্তির সংস্কার সম্পর্কে আলোচনায় বলেন, “তিনি ছিে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক। তাঁর সংস্কারের ফলে এক সমে বর্বর এক জাতি মর্যাদার উচ্চাসনে সমাসীন হয়। সমাজ থেকে জু খেলা, মদ্যপান, দাসত্ব প্রথা দূর করেন। তিনি সমাজে নারীর মর্য প্রতিষ্ঠা করেন ।”
ক. কোন যুদ্ধে পর পর তিনজন সেনাপতি শহিদ হন?
খ. নবম হিজরিকে ‘প্রতিনিধি প্রেরণের বছর’ বলা হয় কেন?
গ. শিক্ষক সাজেদুল ইসলামের আলোচ্য সংস্কারের বিষয়গুলে কোন বিখ্যাত ব্যক্তির সংস্কারের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য দেখাও।
ঘ. উক্ত বিখ্যাত সমাজসংস্কারক সম্পর্কে শিক্ষকের মন্তব্যের যথার্থতা বিশ্লেষণ কর ।
সৃজনশীল উত্তর ০৭
ক. মুতার যুদ্ধে যায়েদ-বিন হারেসা, জাফর ইবনে আবু তালেব ও আব্দুল্লাহ ইবনে রাওয়াহা- এই তিনজন সেনাপতি পর পর শহিদ হন ।
খ. নবম হিজরি ইসলাম প্রসারের এক গুরুত্বপূর্ণ বছর। ইবনে হিশাম বলেন, “নবম হিজরিতে হজরত মুহম্মদ (স.) অসংখ্য প্রতিনিধিকে ইসলাম ধর্ম গ্রহণের উদ্দেশ্যে সাদরে অভ্যর্থনা জ্ঞাপন করেন বলে উক্ত বছরকে প্রতিনিধি প্রেরণের বছর বা সানাত আল উফুদ বলা হয়।
ওমান, হাযরামাউ, নাজরান, মাহরা, বাহরাইন প্রভৃতি যে সব অঞ্চলে কোনো প্রকার অভিযান প্রেরণ করা হয়নি সে সব অঞ্চল হতে প্রতিনিধি। মদিনায় প্রেরিত হয়। মক্কা বিজয়ের অব্যবহিত পরে হজরতের আমন্ত্রণক্রমে এসব প্রতিনিধি ইসলামে বিশ্বাস স্থাপন করে। ইয়েমেনের অনেক গোত্রও ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়।
মূলকথা : ৬৩১ খ্রিষ্টাব্দে মহানবি (স.) তাঁর প্রতিনিধিদের ইসলামের দাওয়াত দিয়ে বিভিন্ন স্থানে প্রেরণ করেন।
গ. শিক্ষক সাজেদুল ইসলামের আলোচনায় যে সব সংস্কারের কথা বলা হয়েছে, সে সব সংস্কার মহানবি (স.)-এর সংস্কারের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ।
মহানবি (স.) নারীকে তাদের পিতা বা স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী স্থাপন করে তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। তিনি ঘোষণা করেন, “মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।”
মহানবি (স.) সমাজ থেকে মদ্যপান, জুয়াখেলা, পতিতাবৃত্তিসহ অন্যান্য কুৎসিত প্রথা উচ্ছেদ করে শান্তিশৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন ।
মহানবি (স.) ঘোষণা করেন, “সব মানুষ সমান, কালোর উপরে সাদা অথবা সাদার উপরে কালোর কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই। মানুষের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও উত্তম সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর প্রতি অধিক অনুগত এবং মানুষের সর্বাধিক কল্যাণকামী ।
মহানবি (স.) সব জাতি ও গোষ্ঠীর মানুষকে সমান অধিকার প্রদান করে মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন। মহানবি (স.) যাকাতভিত্তিক ও সুদবিহীন অর্থব্যবস্থার সূচনা করেন। ফলে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়।
মহানবি (স.) সব ধর্মের সমান অধিকার দেন। তিনি বলেন, “কোনো মুসলিম যদি কোনো অমুসলিমের অধিকার খর্ব করে, তা হলে আমি কিয়ামতের ময়দানে ওই মুসলিমের বিপক্ষে সাক্ষ্য দেব।” বর্তমান সংঘাতময় পৃথিবীতে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য মহানবি (স.)-এর সংস্কার গ্রহণ করা দরকার।
মূলকথা : মহানবি (স.) মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও অর্থনৈতিক সংস্কার সাধন করেন।
ঘ. শিক্ষক সাজেদুল ইসলাম তার আলোচনায় বলেন যে, তিনি ছিলেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সংস্কারক। মহানবি (স.)-এর বিভিন্ন সংস্কার আলোচনা করলে দেখা যায়, মহানবি সম্পর্কে তার বক্তব্যটি যথার্থ। আরবের সমাজব্যবস্থা ছিল অন্ধকারাচ্ছন্ন।
মহানবি (স.) আল-কুরআনের নীতিমালার ভিত্তিতে সমাজকাঠামো বিনির্মাণ করেন। গোত্রভিত্তিক সমাজে নতুন সম্প্রীতির সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন । মহানবি (স.) সব জাতি ও গোষ্ঠীর মানুষকে সমান অধিকার প্রদান করে মদিনা সনদ প্রণয়ন করেন। ফলে সার্বজনীন সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। শাসনব্যবস্থায় তিনি ঐশীতন্ত্র ও গণতন্ত্রের সমন্বয় সাধন করে একটি সুশৃঙ্খল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।
মহানবি (স.) যাকাতভিত্তিক ও সুদবিহীন অর্থব্যবস্থার সূচনা করেন। ফলে অর্থনৈতিক সাম্য প্রতিষ্ঠিত হয়। মহানবি (স.) নারীকে তাদের পিতা বা স্বামীর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী স্থাপন করে তাদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি করেন। তিনি ঘোষণা করেন, “মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।” তিনি দাসদাসীর প্রতি সদয় ব্যবহারের নির্দেশ দেন। মহানবি (স.) সমাজ থেকে মদ্যপান, জুয়াখেলা, পতিতাবৃত্তিসহ অন্যান্য কুৎসিত প্রথা উচ্ছেদ করে শান্তিশৃঙ্খলাপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। মহানবি (স.) ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সমাজে সবার মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করেন। পরিশেষে বলা যায়, মহানবি (স.)-এর সংস্কার বর্তমান বিশ্বে অনুসরণ করলে সব অশান্তি দূর হয়ে সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
মূলকথা : মহানবি (স.) সামাজিক অনাচার রোধ করে, সাম্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতে সমাজ গঠন করেন।
সৃজনশীল প্রশ্ন-৮।
বিরূপ আবহাওয়া, প্রকৃতির শুষ্কতা ও রুক্ষতার জন্য মক্কাবাসীগণ কোনো কিছু ভালোভাবে চিন্তা করতে পারতো না। পুতুল পূজার পরিবর্তে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের অর্থোপার্জনের পথ, সামাজিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক প্রভুত্ব সবই শেষ হয়ে যাবে। অপরদিকে শস্য-শ্যামল ও স্বাস্থ্যকর মদিনার অধিবাসীগণ সত্য ও শান্তির ধর্ম ইসলামকে সাদরে গ্রহণ করেন এবং মদিনার দুটি গোত্র মহানবি (স.)-কে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গ্রহণ করে। এভাবে সত্যের ডাকে ও কর্তব্যের খাতিরেই মহানবি (স.)-কে মদিনায় হিজরত করতে হয়েছিল।
ক. মদিনার পূর্ব নাম কী ছিল?
খ. কাদেরকে আনসার ও মুহাজির বলা হয়?
গ. মহানবি (স.) এর হিজরতের কারণগুলো উদ্দীপকের আলোকে ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকে উল্লিখিত কারণ ব্যতীত মহানবি (স.) মদিনায় হিজরতের আরো কারণ আছে কি? তোমার উত্তরের সপক্ষে যুক্তি দাও ।
সৃজনশীল উত্তর ০৮
ক. মদিনার নাম ছিল ইয়াসরিব।
খ. আনসার শব্দের অর্থ সাহায্যকারী। যেসব মদিনাবাসী মক্কা থেকে আগত হিজরতকারী সাহাবিদের ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করে তাদেরকে আশ্রয় দিয়ে নিজস্ব ও পৈত্রিক সম্পত্তি সমভাবে ভোগ করার সুযোগ দিয়েছিলেন; তাঁদের ‘আনসার’ বা সাহায্যকারী বলা হয়। ধর্মভাইদের প্রতি এরূপ আত্মত্যাগ পৃথিবীর ইতিহাসে আর কোথাও দেখা যায় না।
অন্যদিকে মুহাজির শব্দের অর্থ হিজরতকারী, প্রস্থানকারী, দেশত্যাগকারী ইত্যাদি। ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায়, ইসলামের জন্য নিজ দেশ, সম্পদ, পরিবার, আত্মীয়-পরিজন ত্যাগ করে অন্য দেশে গমনকারীদের মুহাজির বলা হয়। এরা মহানবি (স.)-এর প্রিয় সাহাবি।
মূলকথা : যেসব মদিনাবাসী মুহাজিরদেরকে আশ্রয় দিয়েছিল তারা আনসার এবং যেসব মক্কাবাসী নিজ দেশ, সম্পদ, পরিবার, আত্মীয়- স্বজন ত্যাগ করে মহানবি (স.)-এর সাথে মদিনায় গিয়েছিল তারা মুহাজির নামে পরিচিত।
গ. মহানবি (স.) এর হিজরতের কারণগুলো উদ্দীপকের আলোকে নিচে ব্যাখ্যা করা হলো-
→ পরিবেশগত কারণ : অনুর্বর ও পর্বতময় মক্কার অধিবাসীরা শুষ্ক জলবায়ু ও উষ্ণ আবহাওয়ার জন্য রুক্ষ ও বদমেজাজি ছিল। অপরদিকে শস্যশ্যামল ও সুশীতল আবহাওয়ার জন্য মদিনাবাসী অপেক্ষাকৃত শান্ত স্বভাবের, হিতাহিত জ্ঞানসম্পন্ন ও সরলমনা ছিল। তাই মদিনাবাসীগণ ভালো-মন্দ বুঝতে পেরে মহানবি (স.) কে সহজেই গ্রহণ করে সেখানে যাওয়ার আমন্ত্রণ জানায়।
আভিজাত্য ও কৌলীন্যের প্রভাব : ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হলে মক্কার কুরাইশদের আভিজাত্য ও কৌলীন্যপ্রথা বিলীন হওয়ার উপক্রম হয়। মহানবি (স.) বলেন, “বংশ, জন্ম বা পৌরোহিত্যের জন্য মানুষ কোনো বিশেষ অধিকার লাভ করতে পারে না।” ঐতিহাসিক যোসেক হেল বলেন, “মক্কার শাসকবর্গ ইসলামের শিক্ষার প্রতি যতখানি না শত্রুভাবাপন্ন ছিল, তার তুলনায় বেশি বিরুদ্ধভাবাপন্ন ছিল ইসলাম কর্তৃক আনীত সম্ভাব্য সামাজিক ও রাজনৈতিক বিপ্লবের প্রতি।” ফলে মক্কাবাসীর ইসলামের প্রতি বিরোধিতা তীব্র হলে মহানবি (স.) মদিনা হিজরতের মনস্থ করেন।
⇒ কুরাইশদের স্বার্থে আঘাত : মক্কার কাবাঘরের সেবায়েত নিযুক্ত হয়ে কুরাইশগণ বিগ্রহের রক্ষণাবেক্ষণ, উপাসনা, বার্ষিক তীর্থ পরিচালনা ইত্যাদির একচেটিয়া পৌরিহিত্য করত। আল্লাহর একত্ববাদ প্রতিষ্ঠিত হলে তাদের পৌরোহিত্য বিলীন হয়ে আর্থিক ক্ষতি হবে। এই আশঙ্কায় তারা মহানবি (স.)-এর বিরোধিতা করে। পক্ষান্তরে মদিনায় এরূপ কোনো সম্প্রদায় না থাকায় সেখানে বসবাস ও ধর্মপ্রচার সহজ হবে বিধায় মহানবি (স.) হিজরতের আগ্রহ প্রকাশ করেন ।
→ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমন্ত্রণ মলিনায় আওস ও খাযরাজ গোত্র দুটি তাদের মধ্যকার বুয়াস নামক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ হতে রক্ষা পাওয়ার জন্য একজন মধ্যস্থতাকারীর সন্ধান করছিল। মুহম্মদ (স.)-এর সংবাদ পেয়ে তারা তাদের মধ্যে শান্তি স্থাপনের জন্যে মহানবি (স.)-কে মদিনায় আমন্ত্রণ জানায়।
উপর্যুক্ত ব্যাখ্যা শেষে বলা যায়, পরিবশেগত কারণ, আভিজাত্য ও কৌলিন্যের প্রভাব, কুরাইশদের স্বার্থে আঘাত, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমন্ত্রণ প্রভৃতি উদ্দীপকে উল্লিখিত কারণসমূহ মহানবি (স.)-এর মদিনায় হিজরত করার অন্যতম কারণ।
মূলকথা : পরিবেশগত কারণ, আভিজাত্য ও কৌপীন্যের প্রভাব, কুরাইশদের স্বার্থে আঘাত, মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আমন্ত্রণ প্রভৃতি কারণসমূহ উদ্দীপকে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঘ. হ্যাঁ, আমি মনে করি উদ্দীপকে উল্লিখিত কারণ ব্যতীত মহানবি (স.) মদিনায় হিজরতের আরও কারণ বিদ্যমান। নিচে আমার উত্তরের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হলো-
→ মনস্তাত্ত্বিক কারণ : পৃথিবীর ইতিহাস বিশ্লেষণে দেখা যায় যে, কোনো নবি বা মনীষী তার স্বদেশবাসী কর্তৃক সম্মানিত হন নি। কাজেই মহানবি (স.) ও মক্কাবাসীর দ্বারা সম্মানিত না হয়ে নির্যাতন ও অত্যাচার ভোগ করেন; তাই মক্কাবাসীদের কাছে স্বীকৃতি না পেয়ে তিনি মদিনায় হিজরত করেন।
→ আকাবার শপথ : ৬২১ খ্রিষ্টাব্দে মদিনার আওস ও খাযরাজ গোত্রের ছয়জন লোক মক্কায় এসে ইসালম গ্রহণ করেন। পরের বছর কয়েকজন মহিলাসহ ৭৫ জন মদিনাবাসী ইসলাম গ্রহণ করেন এবং মদিনাবাসীগণ আকাবা নামক স্থানে দুইবার রাসুল (স.)-এর হাতে বায়াত গ্রহণ করে মদিনায় হিজরত করার আহ্বান জানান ফলে মহানবি (স.) হিজরত করতে উদ্বুদ্ধ হন।
→ মক্কাবাসীদের অমানুষিক নির্যাতন: মক্কার অভিজাত কুরাইশরা মনে করে যে, ইসলামের প্রভাব বৃদ্ধির সাথে সাথে তাদের প্রভুত্ব কমে যাবে। তারা মহানবি (স.)-কে চিরশত্রু মনে করে তাঁর উপর অমানুষিক অত্যাচার চালায়, ফলে মহানবি (স.) মক্কা থেকে মদিনায় হিজরত করেন।
→ মদিনার বিভ্রান্তিকর ধর্মমত : পৌত্তলিকতা, জড়বাদ, খ্রিষ্টানবাদের ত্রিত্ববাদ কোনোটিই মদিনার জনগণকে আকৃষ্ট করতে পারে নি। খ্রিষ্টান ও ইহুদি ধর্মে বিকৃত ও দুর্নীতিগ্রস্ত লোক ছিল বিধায় সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত ছিল বলে মদিনাবাসীগণ রাসুল (স.)-এর জীবনাদর্শ উত্তম মনে করে তাঁকে মদিনায় আমন্ত্রণ জানায়।
→ আত্মীয়তার সম্পর্ক : মহানবি (স.)-এর পিতা আব্দুল্লাহ এবং পূর্বপুরুষ হাশিম মদিনায় বিয়ে করেছিলেন। কাজেই মদিনাবাসীদের সাথে আত্মীয়তার সম্পর্ক মহানবি (স.)- কে মদিনায় হিজরতের অনুপ্রেরণা দেয় এবং মদিনাবাসীও মহানবি (স.)-কে সাহায্যের আশ্বাস দেন ।
→ মদিনায় আন্তর্জাতিক পরিবেশ : মদিনায় ইহুদি- খ্রিষ্টানদের বসবাসের ফলে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন সূচিত হয়। মক্কা। তীর্থস্থান হলেও প্রকৃতপক্ষে আরব উপদ্বীপের মদিনায় “আন্তর্জাতিক পরিবেশ গড়ে ওঠে তাই ইসলামকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বিস্তৃতি ঘটানোর জন্য মহানবি (স.) মদিনায় হিজরত করেন।
→ ইহুদিদের মানসিক প্রস্তুতি : মদিনায় বসবাসকারী ইহুদিগণ তাদের ধর্মগ্রন্থ তাওরাতের মাধ্যমে জানতে পারে যে, একজন নবির আবির্ভাব ঘটবে সেজন্যে মহানবি (স.)-এর সাথে তাওরাতের বাণীর মিল খুঁজে পেলে তারা মহানবি (স.)-কে মদিনায় আমন্ত্রণ জানায়।
→ মুসাবের অনুকূল রিপোর্ট : মদিনাবাসীদের আগ্রহ দেখে মহানবি (স.) মুসাব নামক একজন বিশ্বস্ত সাহাবাকে হিজরতের এক বছর পূর্বে মদিনায় ধর্ম প্রচারের জন্য পাঠান এবং মুসাব মদিনায় ইসলাম প্রচারের অনুকূল পরিবেশ রয়েছে বলে মহানবি (স.)-কে জানালে মহানবি (স.) মদিনায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
→ মুহম্মদ (স.)-কে হত্যার পরিকল্পনা: কুরাইশদের বাধা সত্ত্বেও ইসলাম দিন দিন প্রসার লাভ করলে তারা সর্বশেষ নির্যাতন হিসেবে মহানবি (স.)-কে হত্যার পরিকল্পনা করে। এ খবর জানতে পেরে মহানবি (স.) মদিনায় হিজরত করার সিদ্ধান্ত নেন।
এরূপ পরিস্থিতিতে মহানবি (স.) কে মহান আল্লাহ ওহির তাঁতের মাধ্যমে মক্কা ছেড়ে মদিনায় হিজরত করতে নির্দেশ দেন তাই : মহানবি (স.) মদিনায় হিজরত করেন।
মূলকথা : মহানবি (স.) কুরাইশদের হাত থেকে ইসলাম, মুসলমান ও নিজেকে রক্ষার জন্য এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডপে ইসলামকে বিস্তৃতি ঘটানোর উদ্দেশ্যে ওহি লাভের পর মদিনায় হিজরতের “চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।
সৃজনশীল প্রশ্ন-৯।
কমলাপুর গ্রামের মানুষ পার্শ্ববর্তী ইসলামপুর গ্রামের উন্নতিতে ঈর্ষান্বিত হয়ে তাদের আক্রমণ করলে যুদ্ধে কমলাপুর গ্রাম পরাজিত হয় এবং তাদের নেতা নিহত হন । এই পরাজয়ের গ্লানি মুছে ফেলা এবং নেতার হত্যার প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য আবারও ইসলামপুর গ্রাম আক্রমণ করে। ইসলামপুর গ্রামের চেয়ারম্যান ইবনে আব্দুল্লাহ ৫০ জন তীরন্দাজকে নির্দেশ দেন আমরা সবাই যুদ্ধে মারা গেলেও তোমরা এখান থেকে সরবে না। নেতার আদেশ অমান্য করার জন্য ইসলামপুরবাসী এ যুদ্ধে পরাজিত হন ।
ক. উহুদের যুদ্ধে কুরাইশ নেতা কে ছিলেন?
খ. ‘ফাতহুম মুবিন’ কী? ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকের ঘটনা তোমার পাঠ্যপুস্তকের কোন ঘটনার প্রতি কাজীর ইঙ্গিত করেছে? ব্যাখ্যা কর ।
ঘ. “নেতার আদেশ অমান্য করা উক্ত যুদ্ধে পরাজয়ের অন্যতম কারণ”- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর ।
সৃজনশীল উত্তর ০৯
ক. উহুদের যুদ্ধে কুরাইশ নেতা ছিলেন উমাইয়া বংশীয় আবু সুফিয়ান ।
খ. হিজরতের দীর্ঘ ৬ বছর মহানবি (স.) ও তার অনুসারীরা পবিত্র হজ পালন করতে পারেননি। তাই মহানবি (স.) ১,৪০০ জন সাহারি নিয়ে হিজরি জিলকদ মাসের ২৫ তারিখ মক্কার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। কিন্তু কুরাইশরা এ যাত্রাকে ভালোভাবে গ্রহণ না করে মহানবি (স.)-কে বাধা দেয়ার জন্য সার্বিক প্রস্তুতি নেয়।
এ খবর অবগত হওয়ার পর মহানবি (স.) কোরাস ও ওসমান (রা.)-কে কুরাইশদের কাছে পাঠান কিন্তু কুরাইশরা ওসমান (রা.)-কে আটক করে এবং তাকে হত্যা করা হয়েছে এমন গুজব ছড়ায় ফলে মুসলমানগণ ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে এবং প্রতিশোধের প্রতিজ্ঞা করে।
তখন কুরাইশগণ ওসমানকে মুক্তি দেয় ও সুহায়েল বিন আমরকে দিয়ে সন্ধির প্রস্তাব পাঠায় মহানবি (স.) এর কাছে এবং মহানবি (স.) তা সাদরে গ্রহণ করেন। এই সন্ধিই হুদায়বিয়ার সন্ধি নামে পরিচিত এবং পবিত্র কুরআনে এটিকে ‘ফাতহুম মুবিন’ বা শ্রেষ্ঠ বিজয় বলে অভিহিত করা হয়েছে।
মূলকথা : কুরাইশদের সাথে মহানবি (স.) এর হুদাবিয়ার সন্ধিকে পবিত্র কুরআনে ‘ফাতহুম মুবিন’ বলা হয়েছে।
গ. উদ্দীপকের ঘটনা আমার পাঠ্যপুস্তকের ইসলামের ইতিহাসের প্রথম যুগের উহুদ যুদ্ধের প্রতি ইঙ্গিত করেছে। নিচে এ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হলো- ৬২৫ খ্রিষ্টাব্দের ২১শে মার্চ উহুদ প্রান্তরে তুমুল যুদ্ধ শুরু হয়েছিল। উহুদ যুদ্ধের সময় মহানবি (স.) উহুদ পাহাড়ের গোলাকার অংশের বাইরে থেকে যুদ্ধ পরিচালনার মনস্থির করেন এবং সেভাবে সৈন্য সমাবেশ করেন।
মুসলিম শিবিরের পশ্চাতে বাম পাশে একটি গিরিপথ ছিল। রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নির্দেশ ছিল ‘জয় অথবা পরাজয় কোনো অবস্থাতেই মুসলিম তীরন্দাজ বাহিনী যেন গিরিপথ অতিক্রম না করে। চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী মল্লযুদ্ধে হজরত হামজা তালহাকে নিহত করেন। প্রথম দিকে মুসলমানরা পর পর সাফল্য লাভ করে।
এতে শত্রুবাহিনী দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন শুরু করে। যুদ্ধের প্রাথমিক সাফল্যের উল্লাসে মুসলিম সৈন্যবাহিনী শৃঙ্খলা হারিয়ে ফেলে এবং তীরন্দাজ বাহিনী মহানবি (স.)-এর আদেশ ভুলে গিয়ে গিরিপথের রক্ষণাবেক্ষণের পরিবর্তে গণিমতের মাল সংগ্রহে নিয়োজিত হয়। এ সুযোগে শত্রুপক্ষ মুসলমানদের উপর আক্রমণ করে এবং মুসলমানরা পরাজয়বরণ করে।
উদ্দীপকে কমলাপুর গ্রামের মানুষ তাদের নেতার হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ইসলামপুরে আক্রমণ করে। ইসলামপুর গ্রামের চেয়ারম্যান ইবনে আবদুল্লাহ ৫০জন তীরন্দাজকে নির্দেশ দেন আমরা সবাই যুদ্ধে মারা গেলেও তোমরা এখান থেকে সরবে না কিন্তু তারা নেতার আদেশ অমান্য করে ফলে ইসলামপুরবাসী এ যুদ্ধে পরাজিত হয়। সুতরাং উদ্দীপকের ঘটনাটি উহুদ যুদ্ধের ঘটনার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ কেননা উহুদ যুদ্ধের শেষে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে গিয়েও মুসলমানগণ পরাজিত হন।
মূলকথা : উহুদ যুদ্ধের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।
ঘ. “নেতার আদেশ অমান্য করা উক্ত যুদ্ধে তথা উহুদ যুদ্ধে পরাজয়ের অন্যতম কারণ।”- উক্তিটি নিচে ব্যাখ্যা করা হলো- নেতার আদেশ অমান্য করা অপরাধ। কারণ নেতার আদেশ অমান্য করে সফলতা অর্জন সম্ভব হয় না। প্রতি ক্ষেত্রেই বিপর্যয়ের সম্ভাবনা অনিবার্য হয়ে পড়ে। উদ্দীপকের তীরন্দাজদের স্থান ত্যাগ হলো অনুরূপ দৃষ্টান্ত।
উহুদের যুদ্ধে মহানবি (স.) একটি গুরুত্বপূর্ণ গিরিপথকে পাহারা দেয়ার জন্য ৫০ জন তীরন্দাজ নিযুক্ত করেন। তাদেরকে নির্দেশ তা দেওয়া হয় যে, কোনো অবস্থায়ই তারা যেন পরবর্তী নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত গিরিপথ ত্যাগ না করে। উহুদের যুদ্ধ শুরু তাহলে মুসলমানদের আক্রমণে কুরাইশরা পালাতে থাকে।
যুদ্ধে যখন মুসলমানদের জয় নিশ্চিত ঠিক সেই সময় জয়ের উল্লাসে গিরিপথ রক্ষীরা মহানবি (স.)-এর নির্দেশ অমান্য করে। তারা গিরিপথ ত্যাগ করে গণিমাত সংগ্রহে লিপ্ত হয়। পরাজিত প্রায় কুরাইশ বাহিনী এ সুযোগে গিরিপথ দিয়ে অতর্কিত আক্রমণ করে মুসলিম বাহিনীকে পরাজিত করে।
উপর্যুক্ত আলোচনা শেষে বলা যায়, নেতার আদেশ অমান্য করে মুসলিম সৈনিকগণ অবশ্যসম্ভাবী বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হয়ে এক মহান শিক্ষা অর্জন করে। যুদ্ধ ক্ষেত্রে নেতার আদেশ অগ্রাহ্য করা এবং বিশৃঙ্খল হওয়ার যে বিপদ তা তারা মর্মে মর্মে অনুভব করেন। পরবর্তীকালে আর কোনো যুদ্ধেই মুসলিম সৈন্যবাহিনী এরূপ মারাত্মক ভুল করেনি। তাই পরবর্তী – যুদ্ধসমূহে জয় লাভ করার জন্য এ শিক্ষা বেশ সহায়ক হয়েছিল। সুতরাং বলা যায়; নেতার আদেশ অমান্য করা উদ্বুদ যুদ্ধে পরাজয়ের অন্যতম কারণ।
মূলকথা: যুদ্ধক্ষেত্রে বা কোনো প্রতিযোগিতায় দলনেতার নির্দেশ অমান্য করলে নিশ্চিত বিজয়ও ব্যর্থ হয়ে যেতে পারে।
সৃজনশীল প্রশ্ন-১০।
মজিদ লালসালু ঘিরে যে মিথ্যা মাজারটি তৈরি করেছে সেটা দিয়েই তার জীবন জীবিকা নির্বাহ হয়। এটি নিরাপদ করার জন্য সে একদল ভক্তশ্রেণিও তৈরি করে। এলাকার শিক্ষিত শ্রেণি যখন মজিদের এই মিথ্যা প্রতিরোধে সোচ্চার হলো তখন সে তার ভক্তদের নিয়ে প্রতিরোধকারীদের নিঃশেষ করতে উঠে পড়ে লাগল । ফলে উভয় পক্ষ প্রথম সরাসরি যে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হয় তাতে শিক্ষিত শ্রেণিই জয়লাভ করে।
ক. হিজরতের সময় হজরত মুহম্মদ (স.) এর সঙ্গী কে ছিলেন?
খ. হজরত মুহম্মদ (স.) কে আল-আমিন বলা হতো কেন? ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকে উভয় পক্ষের প্রথম লড়াইয়ের সাথে ইসলামের বীর ইতিহাসের কোন যুদ্ধের সামঞ্জস্য রয়েছে? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকের মজিদের স্বার্থ ও কুরাইশদের স্বার্থ একই সূত্রে গাথা- উক্তিটি ব্যাখ্যা কর।
সৃজনশীল উত্তর ১০
ক. হিজরতের সময় হজরত মুহম্মদ (স.)-এর সঙ্গী ছিলেন হজরত আবু বকর সিদ্দিক (রা.)।
খ. বাল্যকাল হতেই হজরত মুহম্মদ (স.) অত্যন্ত সত্যবাদী ও বিশ্বস্ত ছিলেন। আরবের জাহেলি পরিবেশে জন্মলাভ করলেও তাঁর চরিত্র ছিল অত্যন্ত উন্নত। তাঁর কোমল ব্যবহার ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের কারণে মক্কায় তাঁর অবস্থান ছিল অনন্যসাধারণ। অনুকরণীয় সততা, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার – জন্য মক্কার জনগণ তাঁকে আল-আমিন বলে অভিহিত করে। আল-আমিন মানে অত্যন্ত বিশ্বস্ত।
মূলকথা : মুহম্মদ (স.)-এর সততা ও বিশ্বস্ততার জন্য তাঁকে আল- আমিন বলা হতো।
গ. উদ্দীপকে উভয় পক্ষের প্রথম লড়াইয়ের সাথে ইসলামের ইতিহাসের বদরের যুদ্ধের সামঞ্জস্য রয়েছে। নিচে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হলো : মক্কার কুরাইশরা ছিল কা’বা ঘরের মুতাওয়াল্লি। সে সময়ে কা’বাকে ঘিরে সংঘটিত কার্যকলাপের মাধ্যমে কুরাইশরা তাদের জীবিকা নির্বাহ করত।
দেশ-বিদেশ থেকে বহু লোক প্রতি বছর কা’বা ঘর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মক্কায় আসত। আগন্তুকদের থাকা-খাওয়াকে কেন্দ্র করে চলতো মক্কাবাসীর জাত ব্যবসায়-বাণিজ্য। সবার পূজনীয় ও মর্যাদার কেন্দ্রস্থল পবিত্র * কা’বার পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে কুরাইশরা ছিল মর্যাদার আসনে সমাসীন। তারা এখানে বিভিন্ন ধরনের মূর্তি স্থাপন করে এগুলোর পূজা আয়োজন করত।
হজরত মুহম্মদ (স.) যখন ইসলামের বাণী নিয়ে আবির্ভূত হলেন, মূর্তিপূজার পরিবর্তে এক আল্লাহর ইবাদতের প্রতি জনগণকে আহ্বান সোনা জানালেন, তখন কুরাইশরা প্রমাদ গুণতে শুরু করল। তাদের ব্যবসায় শেষ হয়ে যাবে ভেবে মুহম্মদ (স.) ও তার অনুসারীদের উপর নির্যাতন শুরু করল। নির্যাতনের মাত্রা অত্যধিক বৃদ্ধি পেলে হজরত মুহম্মদ (স.) মক্কা ছেড়ে মদিনায় চলে গেলেন এবং সেখানে এক সুন্দর সমাজ গড়ে তুলে তার নেতৃত্ব গ্রহণ করলেন।
মক্কার কুরাইশরা ঈর্ষান্বিত হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধপ্রস্তুতি গ্রহণ করল। এ খবর মদিনায় পৌঁছালে হজরত মুহম্মদ (স.) তাঁর অনুসারীদের নিয়ে কাফিরদের মোকাবিলার জন্য অগ্রসর হলেন। বদরের প্রান্তরে উভয় বাহিনীর সাক্ষাত হলে মুসলিম বাহিনী বিজয় লাভ করে। মূলকথা : মক্কার কাফিরদের সাথে মদিনার মুসলিম বাহিনীর প্রথম যুগ্ম বদরের যুদ্ধ।
ঘ. উদ্দীপকে মজিদ লালসালু ঘিরে তৈরি মিথ্যা মাজার দিয়েই তার জীবিকা নির্বাহ করে। মক্কার কুরাইশরাও কা’বা ঘরে প্রতিষ্ঠিত মিথ্যা ‘প্রভুমূর্তিকে অবলম্বন করে তাদের জীবিকা নির্বাহের পথ করে নিয়েছিল। তাই “উদ্দীপকের মজিদের স্বার্থ ও কুরাইশদের স্বার্থ একই সূত্রে গাঁথা।”- উক্তিটি সঠিক ও যথার্থ। নিচে বিষয়টি ব্যাখ্যা করা হলো :
মুহম্মদ (স.) কর্তৃক ইসলাম প্রচারিত হওয়ার পূর্বে আরব ভূখণ্ড সমকালীন বিশ্বে যে পরিচিতি লাভ করেছিল সেক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করেছিল কা’বা গৃহ। প্রাচীন কালের বিভিন্ন তথ্য থেকে জানা যায় যে, স্বর্গীয় আদিরূপের অনুকরণে হজরত আদম (আ.) এটি নির্মাণ করেছিলেন।
নূহ (আ.) এর মহাপ্লাবনের পর হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও হজরত ইসমাইল (আ.) এটি পুনঃনির্মাণ করেন বলে জানা যায়। নির্মাণের পর থেকে কা’বা গৃহ সমাজ ও রাজনীতির সাথে ধর্মীয় ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। হজরত ইসমাইল (আ.) কর্তৃক কা’বাগৃহ সংস্কারের পর কয়েক বছর এটি ধর্মীয় গৃহ হিসেবে সমাজে প্রভাব বিস্তার করত। পরবর্তীতে বনু জুরহাম ও বনু খুজা আহ গোত্রের মাধ্যমে এ গৃহে মূর্তিপূজা শুরু হয়।
মূর্তিপূজাকে কেন্দ্র করে। কা’বাগৃহ তথা মক্কা নগরি বিখ্যাত বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল। দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার পূজারি পূজার উদ্দেশ্যে মক্কায় আসত। পূজার সামগ্রী এবং আগত পূজারিদের নিয়ে চলত মক্কাবাসীদের ব্যবসায়-বাণিজ্য। মক্কার অনেক লোক আগত পূজারীদের পানি পান করিয়ে বা অন্যান্য সামগ্রী সরবারহ করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করত। উপর্যুক্ত আলোচনার পর সহজেই বলা যায় যে, কুরাইশদের স্বার্থ কা’বাগৃহকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হতো।
মূলকথা : কাবাগৃহকে কেন্দ্র করে মক্কার কুরাইশরা ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতো।
সৃজনশীল প্রশ্ন-১১।
পদ্মার ভাঙন কবলিত একদল লোক নদীর অপর পাড়ে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। ওপারের উর্বর ভূমির আশ্রয় প্রদানকারীদের উঠতি নেতা জাহাঙ্গীরসহ প্রায় সকলে মিলে আশ্রিতদের সহযোগিতা করে। কেউ যাতে অসহযোগিতা বা বিশৃঙ্খলা তৈরি করতে না পারে সেজন্য উভয় পক্ষ মিলে একটি সমঝোতা দলিলও স্বাক্ষর করে। নদীভাঙা আশ্রিতরা আশ্রয় দাতাদের সাথে মিলেমিশে তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে এলাকাটিকে একটি আদর্শ বসতিতে রূপান্তর করে। কিন্তু এ অবস্থায় এলাকার নেতৃত্ব যোগ্যতার কারণে আশ্রিতদের হাতে চলে যাওয়ায় জাহাঙ্গীর তার কিছুসংখ্যক লোকজনসহ আশ্রিতদের উৎখাতে ষড়যন্ত্র করতে |
ক. প্রাক-ইসলামি যুগে আরববাসীর প্রধান খাদ্য কী ছিল?
খ. ‘আকাবার শপথ’ বলতে কী বোঝায়? ব্যাখ্যা কর।
গ. উদ্দীপকের জাহাঙ্গীরের সাথে মদিনায় কোন ইহুদি নেতার সামঞ্জস্য দেখা যায়? ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকের আশ্রিতদের মতোই মদিনার মুহাজিরদের অবস্থা ছিল। ব্যাখ্যা কর।
সৃজনশীল উত্তর ১১
ক. প্রাক-ইসলামি যুগে আরববাসীর প্রধান খাদ্য ছিল খেজুর।
খ. মহানবি (স.) হজ মৌসুমে বিদেশি তীর্থযাত্রীদের মধ্যে ইসলাম ধর্মের প্রচার করতেন। এ প্রচারের প্রভাবে কিছু লোক আকাবা নামক পাহাড়ের পাদদেশে রাসুল (স.)-এর সাথে সাক্ষাত করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে আমৃত্যু ইসলামের পথে সংগ্রাম করার শপথ নেন।
এই শপথকেই আকাবার শপথ বলা হয়। পরপর তিন বছর আকাবার শপথ অনুষ্ঠিত হয়। ৬২০ খ্রিষ্টাব্দে খাযরাজ গোত্রের ৬ জন, ৬২১ খ্রিষ্টাব্দে আউস গোত্রের ২ জন ও খাযরাজ গোত্রের ১০ জন এবং ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে ২ জন মহিলাসহ মোট ৭৫ জন ইয়াসরিববাসী আকাবার শপথে অংশগ্রহণ করেন।
মূলকথা : আকাবা পাহাড়ের পাদদেশে রাসুল (স.) এর সাথে হজ মৌসুমে সাক্ষাত করে ইয়াসরিববাসীরা ইসলামের পক্ষে কাজ করার যে শপথ নেয়, তই আকাবার শপথ ।
গ. উদ্দীপকে বলা হয়েছে পদ্মার ভাঙন কবলিত একদল লোক নদীর অপর পাড়ে গিয়ে আশ্রয় গ্রহণ করে। ওপারের উর্বর ভূমির আশ্রয়প্রদানকারীদের উঠতি নেতা জাহাঙ্গীরসহ প্রায় সবাই মিলে আশ্রিতদের সহযোগিতা করে। কিন্তু পরে ওপারের নেতৃত্ব আশ্রিতদের হাতে চলে গেলে জাহাঙ্গীর তার কিছু সহযোগীকে নিয়ে আশ্রিতদের উৎখাত করতে ষড়যন্ত্র করতে থাকে।
এখানে উল্লেখিত জাহাঙ্গীরের সাথে ইহুদি নেতা আব্দুল্লাহ বিন উবাই এর সামঞ্জস্য দেখা যায়। নিচে এর ব্যাখ্যা করা হলো : রাসুল (স.) মক্কায় নির্যাতিত হয়ে দলবলসহ মদিনায় হিজরত করলেন। আত্মীয়তার সম্পর্কের কিছু লোক মদিনায় থাকায় এবং আউস ও খাযরাজ গোত্রের লোকদের আমন্ত্রণ পাওয়ায় ঐ এলাকাটি মুহম্মদ (স.)-এর জন্য অনুকূলে ছিল। তবে সেখানে কিছুসংখ্যক মূর্তিপূজক লোক ছিল। তাদের নেতা ছিল আব্দুল্লাহ বিন উবাই। সে পুরো মদিনার নেতৃত্ব গ্রহণের অভিলাষী ছিল।
কিন্তু রাসুল (স.) এর মদিনায় আগমনের ফলে তার সেই আশার গুড়েবালি পড়ল। কেননা আপন যোগ্যতাবলে রাসুল (স.) সহজেই মদিনার নেতৃত্ব পেয়ে যান। তাই আব্দুল্লাহ বিন উবাই তার কতিপয় সহযোগীকে নিয়ে রাসুল (স.) এর সাথে শত্রুতা শুরু করে। সে রাসুল (স.) কে মদিনা থেকে বিতাড়িত করতে চায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়।
মূলকথা : আব্দুল্লাহ বিন উবাই নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হওয়ার কারণে রাসুল (স.) এর বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
ঘ. উদ্দীপকের আশ্রিতদের মতোই মাদিনার মুহাজিরদের অবস্থা ছিল। কথাটি নিচে ব্যাখ্যা করা হলো : রাসুল (স.) এর জন্ম মক্কার কুরাইশ বংশে। এখানেই লালিত পালিত হন, বড় হন এবং নবুওয়াত লাভ করেন। নবুওয়াত লাভের পরই তিনি ইসলামের প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন।
মক্কার মুশরিকদের নেতৃত্ব কর্তৃত্ব চলে যাওয়ার ভয়ে তারা বিরোধিতা শুরু করে, অত্যাচারের স্টিম রোলার চালায়। এ অবস্থায় কিছুটা অনুকূল পরিবেশ থাকায় রাসুল (স.) মদিনায় হিজরত করেন। সেখানকার অধিবাসীদের প্রভাবশালী আউস ও খাযরাজ গোত্র রাসুল (স.) কে সাদরে গ্রহণ করে। রাসুল (স.) এর সুযোগ্য নেতৃত্বে এদুটি গোত্র দীর্ঘদিনের শত্রুতা ভুলে পরস্পর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে আবদ্ধ হয়।
মক্কা থেকে হিজরত করে যারা মদিনায় যায় তাদেরকে মুহাজির বলা হয়। আর মদিনাবাসী যারা মুহাজিরদের সহযোগিতা করে ও আশ্রয় দেয় তাদের বলা হয় আনসার। আনসাররা মুহাজিরদেরকে এমনভাবে সহযোগিতা করে যে তাদের নিজস্ব সহায় সম্পত্তি | মুহাজিরদের ভোগ করতে দেয়। এমনকি যার দুজন স্ত্রী ছিল, সে একজনকে তালাক দিয়ে মুহাজিরকে বিয়ে করার সুযোগ করে দেয়।
মদিনায় পৌঁছে মুহম্মদ (স.) ওখানকার সব গোষ্ঠী। ও সম্প্রদায়কে সংঘবদ্ধ করে ‘মদিনা সনদ’ নামক ঐতিহাসিক চুক্তি সম্পাদন করেন। তিনি সেখানে একটি মসজিদ নির্মাণ। করেন এবং প্রকাশ্যে জামায়াতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের ব্যবস্থা করেন। এভাবে গোটা মদিনার নেতৃত্ব চলে আসে | মুহম্মদ (স.) এর হাতে।
পরিশেষে বলা যায়, উদ্দীপকের আশ্রিতদের মতোই মদিনার মুহাজিরদের অবস্থা ছিল।
মূলকথা : মদিনায় মুহাজিররা আনসারদের পূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছিল।
সৃজনশীল প্রশ্ন-১২। ‘
নারীর ক্ষমতায়ন’ বিষয়ক সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিশিষ্ট সমাজসেবক মি. ইশতিয়াক মাহমুদ তার বর্তমান অবস্থানের পেছনে স্ত্রীর সহযোগিতার কথা অকপটে প্রকাশ করলেন। শ্রোতারা মুগ্ধ হয়ে শুনলেন এবং নারীর তৎপরতায় পরিবারের ছোট-বড় সবাই কীভাবে পূর্ণতায় পর্যবসিত হয়, তা অনুধাবন করলেন ।
ক. মদিনা সনদ কত খ্রিষ্টাব্দে প্রণীত হয়?
খ. হুদায়বিয়ার সন্ধিকে ‘ফাতহুম মুবিন’ বলা হয়েছে কেন?
গ. উদ্দীপকের আলোকে হজরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনে বিবি খাদিজা (রা.)-এর অবদান ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকের আলোকে তৎকালীন নারীর সামাজিক মর্যাদা বিশ্লেষণ কর ।
সৃজনশীল উত্তর ১২
ক. ৬২২ খ্রিষ্টাব্দে ।
খ. হজরত মুহম্মদ (স.)-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও প্রতিভার পরিচায়ক হুদায়বিয়ার সন্ধিকে মহাগ্রন্থ আল কুরআনে ‘ফাতহুম মুবিন’ বা প্রকাশ্য বিজয় বলে অভিহিত করা হয়েছে। এ সন্ধি বাহ্যত মুসলমানদের স্বার্থের পরিপন্থী এবং অপমানজনক বলে প্রতীয়মান হলেও এটা ছিল ইসলামের নিরঙ্কুশ বিজয়ের সংকেতস্বরূপ।
এই সন্ধি মহানবি (স.)-এর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও কূটনৈতিক দূরদর্শিতার পরিচয় বহন কর। এ সন্ধি ছিল. বাস্তবিকই কৌশলপূর্ণ পশ্চাৎপদ কিন্তু রণচাতুর্যপূর্ণ বিজয় । এসব তাৎপর্যের কারণে হুদায়বিয়ার সন্ধিকে ফাতহুম মুবিন বলে।
মূলকথা : ইসলামের ইতিহাসে হুদায়বিয়ার সন্ধির ফলাফল সুদূরপ্রসারী।
গ. উদ্দীপকের আলোকে হজরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনে বিবি খাদিজা (রা.)-এর অবদান নিচে আলোচনা করা হলো : হজরত মুহম্মদ (স.)-এর অনুপম চরিত্র ও সত্যনিষ্ঠার কথা আরবের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়লে মক্কা নগরীর এক ধনাঢ্য ৪০ বছর বয়স্ক বিধবা তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি মুহম্মদ (স.)-কে তাঁর ব্যবসায়ের তত্ত্বাবধায়ক নিযুক্ত করেন।
হজরত মুহম্মদ (স.)-এর কর্মদক্ষতায় মুগ্ধ হয়েই তিনি মুহম্মদ (স.)-কে বিয়ের প্রস্তাব দিলে মুহম্মদ (স.) রাজি হন। বিয়ের পর থেকে বিবি খাদিজা ছিলেন তাঁর সকল কাজের প্রেরণা ও সান্ত্বনার উৎস। হজরত মুহম্মদ (স.) হেরা পর্বতের গুহায় ধ্যানে মগ্ন থাকতেন । ৪০ বছর বয়সে ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি আল্লাহর কাছ থেকে জিবরাইল (আ.)-এর মারফত ঐশী বাণী লাভ করেন। পবিত্র রমজান মাসের ২৭ তারিখে পবিত্র কুরআন তাঁর উপর নাজিল হয়। এ অলৌকিক ঘটনায় তিনি হতবিহ্বল হয়ে পড়লে বিবি খাদিজা তাঁকে সান্ত্বনা দেন।
হজরত মুহম্মদ (স.)ও বিবি খাদিজাকে শ্রদ্ধা ও ভালোবাসতেন। নবুয়তের দশম বছর হজরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনসঙ্গিনী খাদিজা (রা.) এবং তাঁর দুর্দিনের আশ্রয়দাতা ইহকাল ত্যাগ করেন। তাঁদের অভাবে মুহম্মদ (স.) অত্যন্ত ম্রিয়মাণ হয়ে পড়েন। পরিশেষে বলা যায়, বিবি খাদিজা মুহম্মদ (স.)-এর পাশে ছায়ার মতো থাকতেন।
মূলকথা : বিবি খাদিজার চরিত্রের জন্য মক্কাবাসী তাকে খাদিজাতুত- তাহিরা নামে ডাকতেন।
ঘ. উদ্দীপকের আলোকে তৎকালীন নারীর সামাজিক মর্যাদা নিচে আলোচনা করা হলো : নারী জাতির প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও সমাজজীবনে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধি হজরত মুহম্মদ (স.)-এর সংস্কারের একটি উল্লেখযোগ্য দিক। ইসলামের আবির্ভাবের পূর্ব পর্যন্ত কোনো ধর্মই নারীকে সমাজে তার প্রাপ্য মর্যাদা দান করেনি। এতকাল তারা ভোগের সামগ্রীরূপে গণ্য হতো।
মহানবি (স.) পিতৃপ্রধান সমাজ গঠন করলেও সমাজে নারীজাতির মর্যাদা প্রতিষ্ঠাকল্পে নিরলসভাবে কাজ করে যান। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে, “নারীর উপর পুরুষের যতটা অধিকার আছে, পুরুষের উপর নারীরও ঠিক ততটা অধিকার আছে।” তিনি আরও বলেন “তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি সর্বোত্তম, যে তার স্ত্রীর প্রতি সর্বোত্তম ব্যবহার করে।
মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত”- এই বাণীর মাধ্যমে নারীজাতির প্রতি তাঁর শ্রদ্ধাবোধের গভীরতা প্রকাশ পায়। তারই প্রচেষ্টায় পুরুষের পবিত্র আমানত ও কল্যাণময়ী রূপে নারীসমাজে স্থান লাভ করেছে। হজরত মুহম্মদ (স.) পারিবারিক ও বৈবাহিক আইন সংশোধন করে নারীজাতিকে ভোগের সামগ্রীর পরিবর্তে অর্ধাঙ্গিনী ও জীবনসঙ্গিনী রূপে প্রতিষ্ঠিত করেন।
তিনি তাদেরকে পিতা ও মৃত স্বামীর সম্পত্তির অধিকারী এবং বিয়েতে সম্মতি প্রকাশের স্বাধীনতা প্রদান করেন। আরব সমাজে কন্যাসন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর জীবন্ত কবর দেয়ার যে অমানুষিক রীতি প্রচলিত ছিল, তিনি তা চিরতরে রহিত করেন। মোট কথা, নারীর প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন ও তার মর্যাদা বৃদ্ধি মহানবি (স.)-এর প্রচারিত জীবন-দর্শনের এক অপরিহার্য অংশ ছিল ।
পরিশেষে বলা যায়, তৎকালীন নারীরা সর্বক্ষেত্রে যেরূপ অবহেলিত ছিল, মহানবি (স.) তার সমাধান করে নারীদের সর্বোৎকৃষ্ট মর্যাদা দেন।
মূলকথা : মহানবি (স.) বলেন, ‘মায়ের পদতলে সন্তানের বেহেশত।’
সৃজনশীল প্রশ্ন-১৩।
শরীফপুর গ্রামের চৌধুরী ও তালুকদার বংশের বিরোধ বহুকাল যাবৎ চলে আসছে। এতে উভয় পক্ষেরই জানমালের বহু ক্ষতি হয়েছে। গ্রামের, কয়েকজন শিক্ষিত যুবক এ অবস্থার অবসানকল্পে একটি শান্তিসংঘ গঠন করে। এ সংঘ গ্রামের শান্তি বজায় রাখার পাশাপাশি মানবসেবার লক্ষ্যে কাজ করার ঘোষণা দেয়। তাদের এই বিচক্ষণ সিদ্ধান্ত ছিল গ্রামে শান্তিপূর্ণ ও কল্যাণকর পরিবেশ নিশ্চিত করার জন্য একটি দৃঢ় পদক্ষেপ।
ক. হজরত মুহম্মদ (স.) কখন জন্মগ্রহণ করেন?
খ. ‘আল-আমিন’ কাকে এবং কেন বলা হতো?
গ. উদ্দীপকের শরীফপুর গ্রামের যুবকরা ইসলামের ইতিহাসের কোন ঘটনার অনুপ্রেরণায় শান্তিসংঘ গঠন করেছিল? বর্ণনা কর ।
ঘ. উদ্দীপকের শান্তিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠান সমাজের শান্তি প্রতিষ্ঠায় কী ভূমিকা রাখতে সক্ষম- বিশ্লেষণ কর ।
সৃজনশীল উত্তর ১৩
ক. ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে ।
খ. মহানবি (স.)-কে আল-আমিন বলা হয়। তিনি ছিলেন বিশ্বশান্তির পথিকৃৎ। তিনিই একমাত্র মহামানব যিনি তাঁর জীবদ্দশায় তাঁর কাজের সফলতা অবলোকন করার সৌভাগ্য অর্জন করেন। তাঁর প্রতিটি কথা ও কার্যকলাপ ভবিষ্যৎ মুসলিম জীবনের পাথেয়। নম্রতা, বিনয় ও সংস্বভাবের জন্য সকলেই তাঁকে শ্রদ্ধা করত। তাঁর অপরিসীম কর্তব্য-নিষ্ঠা, চারিত্রিক নির্মলতা ও পবিত্রতা, সত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ প্রভৃতি গুণের জন্য আরববাসী তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বাসী উপাধি প্রদান করে ।
মূলকথা : মুহম্মদ (স.)-কে তাঁর নিষ্কলুষ চরিত্রের জন্য আল আমিন বলা হতো।
গ. উদ্দীপকের শরীফপুর গ্রামের যুবকরা ইসলামের ইতিহাসের কুরাইশ ও কায়েস গোত্রের মধ্যে সংঘর্ষের পরিসমাপ্তির জন্য যে শান্তি কমিটি গঠিত হয়েছিল সেই ঘটনার অনুপ্রেরণায় শান্তিসংঘ গঠন করে।
৫৮৫ থেকে ৫৯০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত প্রায় পাঁচ বছর কুরাইশ ও কায়েস গোত্রের মধ্যে সংঘর্ষ চলে। ইসলামের ইতিহাসে এটি “হরব আল-ফুজ্জার’ নামে পরিচিত। এর অর্থ ‘অন্যায় সমর’। আরবের নিয়ম অনুযায়ী নিষিদ্ধ মাসে এই গোত্রীয় যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল বলে এই যুদ্ধকে ‘অন্যায় সমর’ বলা হয়। হজরত মুহম্মদ (স.) তাঁর পিতৃব্যের সাথে এ যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন।
যুদ্ধের বিভীষিকায় হজরত মুহম্মদ (স.) এতই ব্যথিত হয়ে পড়েন যে, এ সমস্ত সংঘাত বন্ধের জন্য এবং গরিব, দুর্বল, অসহায় জনগণকে অত্যাচারী ও সবল ধনীদের হাত থেকে রক্ষা করে আরবে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে একটি কমিটি গঠন করেন।
এটি ‘হিলফুল ফুজুল’ নামে পরিচিত। এর সদস্যগণ কিছু আদর্শ ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের শপথ গ্রহণ করেন। এ কমিটি দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করবে। দুর্বল, এতিম, অসহায়, নিঃস্বদের সাহায্য করবে। অত্যাচারকে প্রাণপণে বাধা দেবে ও উৎপীড়িতকে সাহায্য করবে এবং বিদেশিদের ধন, মান-সম্ভ্রম রক্ষা করবে।
বিশ্বের ইতিহাসে এটিই প্রথম মানবসেবা সংঘ। সাম্য, নেতৃত্ব ও স্বাধীনতার পথপ্রদর্শক হজরত মুহম্মদ (স.)-এর জীবনে গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টির পক্ষে এটি একটি বলিষ্ঠ পদক্ষেপ ছিল।
মূলকথা : হিলফুল ফুজুল গঠনের পর মহানবি (স.) শান্তির অগ্রদূত হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন ।
ঘ. উদ্দীপকের শান্তিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠান সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম। নিচে তা বিশ্লেষণ করা হলো : পাঁচ বছর আরবে কুরাইশ ও কায়েস গোত্রের মধ্যে সংঘর্ষ চলছিল।
ইসলামের ইতিহাসে এটি হারব-আল-ফুজ্জার নামে পরিচিত, এর অর্থ অন্যায় সমর। হজরত মুহম্মদ (স.) আরবে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গরিব, অসহায় জনগণকে অত্যাচারী ও সবল ধনীদের হাত থেকে রক্ষা করার জন্য হিলফুল ফুজুল নামে একটি শান্তিসংঘ গঠন করেন। এ শান্তিসংঘের মতো প্রতিষ্ঠান সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠায় অগ্রণী ভূমিকা রাখতে পারবে। যেমন :
১. দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করা।
২. দুর্বল, এতিম, নিঃস্ব ও অসহায়দের সাহায্য করা।
৩. অত্যাচারীকে প্রাণপণে বাধা দেওয়া।
৪. উৎপীড়িতকে সাহায্য করা।
৫. বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে সম্প্রীতি ও সম্ভাব বজায় রাখা।
৬. বিদেশির ধন, মান-সম্ভ্রম রক্ষা করা।
৭. গণতান্ত্রিক পরিবেশ সৃষ্টি করা ইত্যাদি
পরিশেষে বলা যায়, এরূপ সংঘই সমাজের সব অন্যায়, অত্যাচার দূর করতে সক্ষম।
মূলকথা : হিলফুল ফুজুল গণতন্ত্রের পরিবেশ সৃষ্টির সহায়ক।
সৃজনশীল প্রশ্ন-১৪।
সপ্তম শতকে মুসলমানরা ধর্মের ভিত দৃঢ় করার জন্য অনেক ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। ধর্মের জন্য তাদের জানমাল ছিল উৎসর্গীকৃত। ধর্ম প্রবর্তকের আদেশ অনুযায়ী তারা যে কোনো পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত থাকতেন এবং সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যেতেন। ধর্ম রক্ষার যুদ্ধে বেঁচে থাকলে ‘গাজি’ ও মৃত্যুবরণ করলে ‘শহিদ’ হওয়ার গৌরব তাঁদের নিকট অন্য সবকিছুর চেয়ে অধিক মূল্যবান ।
ক. হজরত মুহম্মদ (স.)-এর পিতার নাম কী?
খ. আল-আকাবার শপথ সম্পর্কে লেখ ।
গ. উদ্দীপকের আলোকে বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের ভূমিকা ব্যাখ্যা কর।
ঘ. উদ্দীপকে উল্লেখিত ধর্মপ্রবর্তকের সামরিক প্রজ্ঞা বিশ্লেষণ কর।
সৃজনশীল উত্তর ১৪
ক. আবদুল্লাহ।
খ. ৬২১ খ্রিষ্টাব্দ যে ১২ জন ইয়াসরিববাসী হজরত মুহম্মদ (স.)- এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তাদের মধ্যে ১০ জন খাযরাজ ও ২ দিন জন আউস সম্প্রদায়ভুক্ত। মক্কার নিকটবর্তী ‘আকাৰা’ নামক স্থানে হজরত মুহম্মদ (স.)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন এবং ইয়াসরিবে প্রত্যাবর্তন করে আল্লাহর মহত্ত্ব প্রচারের জন্য যে অঙ্গীকার করেন, তা ইসলামের ইতিহাসে আকাবার প্রথম শপথ নামে পরিচিত।
৬২২ খ্রিষ্টাব্দে আকাবার ২য় শপথ অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৭৩ চ জন পুরুষ ও ২ জন মহিলা ইয়াসরিববাসী হজরত মুহম্মদ (স.)-এর সঙ্গে আকাবায় গোপনে মিলিত হন। তারা প্রতিজ্ঞা করেন যে, ইসলামের আদর্শ মেনে চলবেন ও তা রক্ষা করার … আপ্রাণ চেষ্টা করবেন।
মূলকথা : আকাবার শপথ ইসলামের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
গ. উদ্দীপকের আলোকে বদরের যুদ্ধে মুসলমানদের ভূমিকা নিচে ব্যাখ্যা করা হলো : ৬২৪ খ্রিষ্টাব্দে ১৩ই মার্চ বদরের যুদ্ধ সংঘটিত হয়। হজরত মুহম্মদ (স.) স্বয়ং যুদ্ধ পরিচালনা করেন । এ যুদ্ধে মুসলমানদের ভূমিকা অপরিসীম। আবু জেহেলের নেতৃত্বে কুরাইশগণ মুসলমানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়লেও মুসলিম বাহিনীর মোকাবিলা করা কুরাইশদের পক্ষে সম্ভব হয়নি।
অসামান্য রণনৈপুণ্য, অপূর্ব বিক্রম নিয়মানুবর্তিতার সঙ্গে যুদ্ধ করে মুসলমানগণ বদরের ও অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধে বিধর্মী কুরাইশদের শোচনীয়ভাবে পরাজিত করে। এ যুদ্ধে ৭০ জন কুরাইশ সৈন্য নিহত ও সমসংখ্যক সৈন্য বন্দি হয়। অন্যদিকে মাত্র ১৪ জন মুসলিম সৈন্য শাহাদাত বরণ করেন।
বদরের যুদ্ধ মুষ্টিমেয় মুসলমানদের মনে আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি করে বিধর্মীদের বিরুদ্ধে জেহাদের অনুপ্রেরণা প্রদান করে। তাদের মনে দৃঢ় বিশ্বাস জন্মে যে, আল্লাহ স্বয়ং তাদের সাহায্যকারী।
বিশাল কুরাইশ বাহিনী স্বল্পসংখ্যক মুসলিম সৈন্যের নিকট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলে বিধর্মীগণ নবপ্রতিষ্ঠিত ইসলাম | ধর্ম ও রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে। সৈন্যসংখ্যা যুদ্ধে ভাগ্য নির্ধারণ করে, এ ধারণা ভ্রান্তিতে পরিণত হয় এবং মুসলমানদের মনে অসামান্য সাহস, উদ্দীপনা । আত্মপ্রভাষের সঞ্চার করে, যা মুসলমানদের ভবিষ্যতে যুদ্ধ জয়ের এক পূর্বার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে।
মূলকথা : বদর যুদ্ধে মুসলমানদের ভূমিকা অপরিসীম গুরুত্বপূর্ণ।
ঘ. উদ্দীপকে উল্লেখিত ধর্ম প্রবর্তকের সামরিক প্রজ্ঞার সাথে তুলনীয় মহানবি (স.)-এর সামরিক প্রজ্ঞা নিচে বিশ্লেষণ করা হলো- মদিনা থেকে ৮০ মাইল দক্ষিণ-পশ্চিমে বদর উপত্যকায় ৬২৪ খ্রিস্টাব্দের ১৩ই মার্চ মুসলিম বাহিনীর সঙ্গে বিধর্মী কুরাইশদের সংঘর্ষ হয়। হজরত মুহম্মদ (স.) স্বয়ং যুদ্ধ পরিচালনা করেন। আল ওয়াকিদি বলেন, “মুহম্মদ (স.) মুসলিম সৈন্য সমাবেশের জন্য এমন একটি স্থান বেছে নেন।
যেখানে সূর্যোদয়ের পর যুদ্ধ শুরু হলে কোন মুসলমান সৈন্যের চোখে সূর্যকিরণ পড়বে না।” বিশাল কুরাইশ বাহিনী স্বল্পসংখ্যক মুসলিম সৈন্যের নিকট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হলে বিধর্মীগণ নব প্রতিষ্ঠিত ইসলাম ধর্ম ও রাষ্ট্রের সামরিক শক্তি সম্বন্ধে সচেতন হয়ে ওঠে। সৈন্যসংখ্যা যুদ্ধে ভাগ্য নির্ধারণ করে, এ ধারণা ভ্রান্তিতে পরিণত হয় এবং মুসলমানদের মনে অসামান্য সাহস, উদ্দীপনা ও আত্মপ্রত্যয়ের সঞ্চার করে, যা … মুসলমানদের ভবিষ্যতে যুদ্ধ জয়ের এক দুর্বার আকাঙ্ক্ষায় উদ্বুদ্ধ করে।
যুদ্ধক্ষেত্র থেকে বিজয়ীবেশে মহানবি (স.) মদিনায় ফিরে এসে পরাক্রমশালী যোদ্ধা, সুদক্ষ সমরনায়ক ও সুবিবেচক শাসকের পূর্ণ মর্যাদা লাভ করেন। হজরত মুহম্মদ (স.) যে শুধু আধ্যাত্মিক শক্তির অধিকারীই নন, পার্থিব ঘটনাবলি বিচারে তিনি যে একজন যোগ্য ও জনপ্রিয় নেতা, তা প্রমাণিত হলো। ধর্ম ও রাষ্ট্র বদর-বিজয়ের ফলে একত্রীভূত হলো এবং হজরত মুহম্মদ (স.) একাধারে নবি ও রাষ্ট্র পরিচালকের দায়িত্বভার পরিচালনা করতে থাকেন।
মূলকথা : মহানবি (স.) বদর-যুদ্ধে যে সামরিক প্রজ্ঞার পরিচয় দেন তা ইসলামের ইতিহাসে খুবই তাৎপর্যপূর্ণ
সৃজনশীল প্রশ্ন-১৬।
ইসলামপুর গ্রামে দুটি পরিবার পাশাপাশি বসবাস করত। তাদের এক পরিবারের প্রধান সলিম ও অন্য পরিবারের প্রধান দবির। দবিরের বাড়ির পাশের রাস্তা দিয়ে সলিমের পরিবারের – সদস্যরা চলাফেরা করত। যার প্রেক্ষিতে মাঝেমধ্যেই ছোটখাটো বিষয়কে কেন্দ্র করে উভয় পরিবারের মধ্যে ঝগড়া হয়। ফলে উভয় পরিবারের মধ্যে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয় এবং দবির সলিমের পরিবারের সদস্যদের চলার রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ফলে এক সময় সলিম বাধ্য হয়ে প্রশাসনের আশ্রয় গ্রহণ করে এবং প্রশাসন দবিরকে শাস্তি প্রদান করে। তবুও দবিরের পরিবার সংশোধন হয়নি।
ক. হজরত মুহম্মদ (স.) কত খ্রিষ্টাব্দে হিজরত করেন?
খ. হজরত মুহম্মদ (স.)-কে আল-আমিন বলা হয় কেন?
গ. বিদায় হজের কোন শিক্ষাটি উদ্দীপকের ঘটনায় অনুপস্থিত? বর্ণনা কর ।
ঘ. বিদায় হজের উক্ত শিক্ষা মুসলিম সমাজ গঠনে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে- বিশ্লেষণ কর।
সৃজনশীল উত্তর
ক. ৬২২ খ্রিস্টাব্দে
খ. হজরত মুহম্মদ (স.)-কে আল-আমিন বলা হতো। কারণ, বাল্যকাল থেকে মুহম্মদ (স.) গভীর চিন্তায় মগ্ন থাকতেন। তাঁর স্বপ্নসমাকুল মুখের দিকে চেয়ে অনেকেই বিস্ময় অনুভব করতেন। বিশ্ব স্রষ্টার বিশালত্ব ও বৈচিত্র্য দেখে তিনি অবাক হতেন। তিনি তাঁর বিনম্র স্বভাব, বিশুদ্ধ চরিত্র, অটল বিশ্বাস, গভীর কর্তব্যনিষ্ঠা, সত্যবাদিতা ও বিশ্বস্ততার জন্য অল্প বয়সেই অধঃপতিত আরববাসীর নিকট থেকে আল আমিন বা সার্থী বিশ্বাসী উপাধি লাভ করেন।
মূলকথা : সদগুণের অধিকারী মহানবি (স.)-কে সকলেই বিশ্বাস করত।
গ. বিদায় হজের উল্লেখযোগ্য একটি শিক্ষামূলক উক্তি উদ্দীপকের ঘটনায় অনুপস্থিত। নিচে তা আলোচনা করা হলো :
মহানবি (স.)-এর জীবনসমগ্রের নির্যাস হলো বিদায় হজের অবিস্মরণীয় ভাষণ। পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত একটি সমাজকে পুনরুদ্ধার করে ইহ-পারলৌকিক কল্যাণের দিকে ধাবিত করার সুস্পষ্ট দিক নির্দেশনা তাঁর বিদায় হজের ভাষণে পরিলক্ষিত হয়। ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে ফেব্রুয়ারি লক্ষাধিক মুসলমান সমভিব্যহারে মক্কায় যাত্রা করে ৭ই মার্চ সেখানে হাজির হন। তাঁর জীবনের শেষ হজ হওয়ার কারণে এটি হুজ্জাতুল বিদা, যা ‘বিদায় হজ’ নামে অভিহিত।
বদরের যুদ্ধ কুরাইশ গোত্রকে দুটি দলে বিভক্ত করে। আবু জেহেল ও আবু সুফিয়ান এই দুগোত্রের নেতৃত্ব দান করেন। গোত্রীয় স্বার্থ ও রাজনৈতিক ঐক্য মক্কার বিধর্মীদের শক্তিকে দুর্বল করে ফেলে। দুগোত্রের মধ্যে দ্বন্দ্ব-কলহ সব সময় লেগেই থাকত ।
মহানবি (স.) জিলহজ মাসের ৯ তারিখে যে ভাষণ দেন, তাতে উল্লেখযোগ্য একটি উক্তি ছিল যে- “হে লোক সকল, শুনে রাখ মুসলিমরা পরস্পরের ভাই। সাবধান! আমার পরে তোমরা একজনকে হত্যা করার মতো কুফরি কাজে লিপ্ত হয়ো না।”
বিদায় হজে সকল মুসলমানকে ভাই হিসাবে পরস্পরের সাথে মহানবি (স.) সৌহার্দ্য স্থাপন করতে বলেছেন। একে অন্যের উপর প্রতিশোধ গ্রহণ থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। কিন্তু এ গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাটি উদ্দীপকে অনুপস্থিত।
মূলকথা : সকল মুসলমান পরস্পরের ভাই। তাই একে অন্যের প্রতি প্রতিশোধ, হিংসা, স্বর্ষা থেকে বিরত থাকা উচিত।
ঘ. বিদায় হজের উক্ত শিক্ষা মুসলিম সমাজ গঠনে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। নিচে তা বিশ্লেষণ করা হলো :
মানুষের অধিকার ও ভালোবাসার পবিত্র দিকগুলো মহানি (স.)-এর ভাষণে বিদ্যমান; এতে অপরের সম্পদ ও সম্মানের নিরাপত্তা ও নাগরিক কর্তব্যবোধ জাগ্রত করে একটি সুন্দর পৃথিবী রচনার নানাদিক প্রস্ফুটিত হয়েছে।
মহানবি (স.)-এর বিদায় হজের ভাষণ ইসলামি রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও মানবিক অধিকারের মূলনীতি ঘোষিত কর্মসূচি। এ ভাষণে মানবজীবনের আধ্যাত্মিক ও বাস্তব উভয় শিক্ষার সুস্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। বস্তুত এই শিক্ষাতেই মানবজাতির মুক্তি ও শান্তি নিহিত।
মহানবি (স.) গোত্রগত দ্বন্দ্ব নিরসনে বিদায় হজ্বে ভাষণে বলেন, হে লোক সকল, আল্লাহ প্রত্যেককেই তার যথাযথ অধিকার দিয়েছেন। সুতরাং উত্তরাধিকারীর জন্য কোনোরূপ ওসিয়ত কার্যকর হবে না।”
সব ধরনের দ্বান্দ্বিক পরিস্থিতি থেকে মানবগোষ্ঠী তাদের স্ব-স্ব সত্তাকে রক্ষা করে, মুসলমানরা পরস্পর পরস্পরের সাথে ভ্রাতৃসুলভ ব্যবহার করে পৃথিবীকে একটি শান্তির নীড় হিসেবে গড়ে তুলতে পারবে। আজও আমরা এ অভিভাষণকে উপজীব্য করে ব্যক্তি ও সমাজজীবনের নানা সমস্যা-সংকট নিরসনে কার্যকর উদ্যোগ নিতে পারি। সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে যুগ-যুগ ধরে গোত্রে গোত্রের মধ্যে যুদ্ধ চলত। মহানবি (স.)- এর সাম্যের বাণী ও ন্যায়বিচারের প্রেক্ষিতে গোত্রকলহের অবসান ঘটে। সমাজে ন্যায় ও সাম্যনীতি প্রতিষ্ঠিত হয়।
মহানবি (স.) বুঝতে পেরেছিলেন যে পরিবার, গোত্র, সমাজে বসবাসকারী মুসলমানরা যদি একে অপরের প্রতি রেষারেষি, প্রতিশোধমূলক হত্যা, প্রতিবেশীর সাথে দ্বন্দ্ব ইত্যাদি নিরসন করতে না পারে, তবে মুসলিম জাতি উন্নতি করতে পারবে না। বিদায় হজের ভাষণে তাই তিনি প্রতিশোধমূলক দ্বন্দ্ব থেকে মুসলিম জাতিকে বিরত থাকতে আদেশ দেন। কারণ, মুসলমানরা পরস্পরের ভাই। অতএব, উপর্যুক্ত আলোচনার শেষপ্রান্তে বলা যায়, বিদায় হজের ভাষণের শিক্ষা মুসলিম সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
মূলকথা : বিদায় হজের ভাষণ ছিল ইসলামের ইতিহাসে একটি মোড় পরিবর্তনকারী ঘটনা।








